উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে দীর্ঘ ও অদক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খলের কারণে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হচ্ছে এবং নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ ও আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন সংস্থাটির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফকরুদ্দিন আল কবির।
গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদক ও খুচরা বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মূল্য ব্যবধান কাঁচা মরিচে, যেখানে দাম বেড়েছে ১১৬ শতাংশ। এছাড়া মাঝারি মানের চালে প্রায় ১০০ শতাংশ, পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, মসুর ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়।
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে ছোট সরবরাহ শৃঙ্খলের পণ্যে মূল্য ব্যবধান অনেক কম। ডিমে ২৫ শতাংশ, মুরগির মাংসে ২২ শতাংশ, গরুর মাংসে ১৩ শতাংশ এবং রুই মাছে ১০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
ঢাকা বিভাগের ১০টি বাজারে ৮২০ জন ব্যবসায়ীর ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে এ গবেষণা পরিচালিত হয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব পণ্য দীর্ঘ বিপণন শৃঙ্খলের মধ্য দিয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, সেগুলোর মূল্য ব্যবধানও বেশি হয়। তাই খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করা জরুরি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০টি পণ্যের মধ্যে পেঁয়াজ, আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন, ডিম ও রুই মাছের ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা মূলত শহরাঞ্চলের আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এতে বাজারে সীমিত সংখ্যক ব্যবসায়ীর প্রভাব বাড়ছে, প্রতিযোগিতা কমছে এবং মূল্য অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে।
মাঝারি মানের চালের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের মাত্র ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ পান কৃষক। বিপরীতে অটো রাইস মিল মালিকরা সবচেয়ে বেশি মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি চালের মজুত, সরবরাহ ও মূল্য নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করেন।
গবেষণা উপস্থাপনকালে ফকরুদ্দিন আল কবির বলেন, দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির জন্য শুধু উৎপাদন ব্যয় দায়ী নয়। সরবরাহ ঘাটতি, বাজারে সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য, মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা, মজুতদারি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণও সমানভাবে দায়ী।
তিনি জানান, দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ এখনও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে অনেক পরিবার খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছে, সঞ্চয় ভাঙছে কিংবা ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) ঝুড়িতে খাদ্যের অংশ ৫৯ শতাংশ। দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে। সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ভোগ ব্যয়ের প্রায় ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যের জন্য ব্যয় করলেও সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে খাদ্যের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ব্যয়ে চলে যায়।
তিনি বলেন, খাদ্যপণ্যের মূল্য নির্ধারণে উৎপাদন ব্যয়, বিপণন ব্যবস্থার অদক্ষতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিবন্ধকতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সরবরাহ ঘাটতি, মজুতদারি ও দুর্বল বাজার প্রতিযোগিতাসহ নানা বিষয় ভূমিকা রাখে। তাই মূল্যবৃদ্ধির জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা ঠিক হবে না।
প্রতিবেদনে সরবরাহ ঘাটতি, অসাধু ব্যবসায়ীদের যোগসাজশ, অন্যায্য মজুতদারি, পর্যাপ্ত হিমাগার ও কোল্ড-চেইন সুবিধার অভাব, ফসল-পরবর্তী সংরক্ষণে দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ উৎপাদন ব্যয়কে খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করা কিংবা বাজারে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিকেই সিন্ডিকেটের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিপিডি খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো, পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, হিমাগার ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামো সম্প্রসারণ, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি বাজার সংযোগ গড়ে তোলা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং প্রমাণিত মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।