দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়। সদ্য শেষ হওয়া আগস্ট মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলার ১২১ টাকা ধরে যার পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা।
আগের বছরের একই মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৪২ কোটি ১৯ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ৫৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, যা শতাংশের হিসাবে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে রেমিট্যান্স প্রবাহ শুধু গত বছরের একই মাসের তুলনায়ই বাড়েনি, আগের মাস জুলাইয়ের তুলনাতেও বেড়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশে এসেছিল ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। ফলে এক মাসের ব্যবধানে আগস্টে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
দুই মাসে রেমিট্যান্স ৫৮৩ কোটি ডলার
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে মোট ৫৮২ কোটি ৫৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
এর মধ্যে জুলাইয়ে এসেছে ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার এবং আগস্টে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ অর্থবছরের দ্বিতীয় মাসে এসে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও শক্তিশালী হয়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৪৯০ কোটি ডলার। সেই হিসাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ৯২ কোটি ডলার, অর্থাৎ প্রায় ১৯ শতাংশ। রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের তারল্য বাড়াতেও সহায়তা করছে।
টানা তিন মাস ২৮০ কোটি ডলারের ওপরে
তবে আগস্টের রেমিট্যান্স প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছালেও এখনও সেই মাইলফলক অতিক্রম করতে পারেনি। গত তিন মাসের হিসাবেও দেখা যায়, প্রতি মাসেই ২৮০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। জুনে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ২৮২ কোটি ২৫ লাখ ডলার। জুলাইয়ে তা বেড়ে হয় ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। আগস্টে আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলারে। অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট—টানা তিন মাস ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ২৮০ কোটি ডলারের ওপরে রয়েছে। আগস্টে এসে তা ৩০০ কোটি ডলারের সীমার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে।
সরকারি ব্যাংকে এসেছে ৪৩৩ কোটি ডলার
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকভিত্তিক হিসাবেও রেমিট্যান্স প্রবাহের একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র পাওয়া যায়। আগস্টে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে এসেছে প্রায় ৪৩৩ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ১৬২ কোটি ৮ লাখ ডলার, সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ১৩৯ কোটি ৯১ লাখ এবং জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রায় ৭৯ কোটি ৩১ লাখ ডলার।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে প্রায় ২৯১ কোটি ৯১ লাখ ডলার।
অপরদিকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে প্রায় ২ হাজার ২৩৪ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রায় ৫৫০ কোটি ৮৯ লাখ, ব্র্যাক ব্যাংক প্রায় ২৫২ কোটি ৮১ লাখ এবং ট্রাস্ট ব্যাংক প্রায় ২১১ কোটি ৪৯ লাখ ডলার রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আগস্টে এসেছে প্রায় ৬ কোটি ৭৪ লাখ ডলার।
রিজার্ভও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ওপরে
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার মধ্যেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ওপরে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৪০৭ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৪৯৭ বিলিয়ন ডলার।
একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া হিসাবে গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৪০৭ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ৩২ হাজার ৪৯৬ দশমিক ৬০ মিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের সাম্প্রতিক চিত্রে তাই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
ডলার সরবরাহে স্বস্তি, তবে চ্যালেঞ্জও আছে
অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। রেমিট্যান্স বাড়লে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ বাড়ে। এতে আমদানি দায় পরিশোধ, বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনা এবং ডলারের বাজারে চাপ কমাতে সহায়তা পাওয়া যায়।
বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে যে চাপ ছিল, তার বিপরীতে রেমিট্যান্স এখন অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে রেমিট্যান্স বাড়লেই রিজার্ভ একই হারে বাড়বে, এমন নয়। কারণ আমদানি ব্যয়, বিদেশি ঋণ ও অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধ, রপ্তানি আয় এবং বিভিন্ন বৈদেশিক লেনদেনের ওপরও রিজার্ভের অবস্থান নির্ভর করে।
তারপরও চলতি অর্থবছরের শুরুতেই রেমিট্যান্সে প্রায় ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং আগস্টে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। রেমিট্যান্সের এই গতি ধরে রাখা গেলে ডলারের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।