রেমিট্যান্স ও রফতানি, দুই খাতেই চাপ বাড়ছে

চলতি অর্থবছরের শুরুতে রেমিট্যান্স ও পণ্য রফতানি দুই খাতেই বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি রয়েছে। তবে মাসভিত্তিক হিসাবে দুটিতেই কমতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। টানা চার মাস ধরে মাসওয়ারি রেমিট্যান্স ৩০০ কোটি ডলারের নিচে রয়েছে। একইভাবে জুলাইয়ের পর প্রতি মাসেই পণ্য রফতানি কমেছে। এর সঙ্গে শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটও উৎপাদন সক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশে ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। আগস্টে এসেছিল ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে প্রবাসী আয় কমেছে ২০ কোটি ৬ লাখ ডলার।

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। আগস্টে তা বেড়ে ২৯৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলারে দাঁড়ায়। সেপ্টেম্বরে আবার কমে ২৭৬ কোটি ৬০ লাখ ডলারে নেমেছে। এর আগে সর্বশেষ মে মাসে মাসওয়ারি রেমিট্যান্স ৩০০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছিল। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে ২৬৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল।

ব্যাংকাররা বলছেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর সুবিধা বাড়ানো এবং ডলারের আনুষ্ঠানিক দর তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকায় রেমিট্যান্সের প্রবাহ মোটের ওপর ইতিবাচক রয়েছে। মাসভিত্তিক ওঠানামা থাকলেও এই প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভে স্বস্তি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখছে।

রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড

এরই মধ্যে গত অর্থবছরে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা মোট ৩ হাজার ৫৫৯ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। ১২ মাসের মধ্যে ছয় মাসেই ৩০০ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে।

এর আগের অর্থবছরেও প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বেড়েছিল প্রায় ২৭ শতাংশ। ওই অর্থবছরেই প্রথমবারের মতো এক বছরে প্রবাসী আয় ৩ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। পরের অর্থবছরে সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যায়।

ব্যাংকারদের মতে, অর্থনীতিতে নানা ধরনের চাপ থাকলেও রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে অর্থের জোগান এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করছে।

মাসভিত্তিক কমেছে রফতানিও

রেমিট্যান্সের মতো পণ্য রফতানিতেও আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে আয় কমেছে। তবে গত বছরের একই মাসের তুলনায় রফতানি বেড়েছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ৩৯৩ কোটি ৭২ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। আগস্টে রফতানি হয়েছিল প্রায় ৪৪৩ কোটি ডলারের। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে রফতানি কমেছে প্রায় ৪৯ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।

এর আগে জুলাইয়ে পণ্য রফতানি হয়েছিল ৪৭৩ কোটি ডলারের। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই মাসভিত্তিক রফতানিতে কমতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রফতানি কমেছিল প্রায় ৩০ কোটি ডলার। আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে কমেছে আরও প্রায় ৪৯ কোটি ডলার।

সেপ্টেম্বর মাস ৩০ দিনের হওয়ায়ও মাসভিত্তিক রফতানিতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট ছিল ৩১ দিনের মাস। গত কয়েক বছরের রফতানি প্রবণতা অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়ে থাকে।

তৈরি পোশাকে প্রবৃদ্ধি

সামগ্রিক রফতানি কমলেও তৈরি পোশাক খাতে প্রবৃদ্ধি রয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ।

এই সময়ে নিট পোশাক রফতানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ। রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৫৯৬ কোটি ডলার। একই সময়ে ওভেন পোশাক রফতানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ, আয় হয়েছে ৪৬১ কোটি ডলার।

সেপ্টেম্বর একক মাসেও তৈরি পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৮৪ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছিল। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৩০৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে নিট পোশাক রফতানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক রফতানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তৈরি পোশাক রফতানিতে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রফতানি খাতের জন্য ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। নিট ও ওভেন দুই ধরনের পোশাকেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা ধরে রাখার ইঙ্গিত দেয়।

জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত

তবে রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট উৎপাদন সক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। অনেক কারখানাই তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।

বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামিম এহসান বলেন, আগস্ট মাসজুড়েই জ্বালানি সংকট ছিল। এর মধ্যেও সেপ্টেম্বরে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হওয়া ইতিবাচক। তবে অধিকাংশ কারখানা সংকটে থাকার পরও কিছু কারখানা নিজস্ব দক্ষতায় অতিরিক্ত রফতানি করতে পারায় এই প্রবৃদ্ধি হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, রফতানির এই তথ্য আগের সময়ের মতো ‘উদ্ভাবিত’ হয়েছে, এমনটি তিনি বিশ্বাস করতে চান না।

শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে কারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব ভবিষ্যতের রফতানি আদেশ ও উৎপাদনেও পড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

তিন মাসে রফতানি বেড়েছে ৬ শতাংশের বেশি

মাসভিত্তিক কমলেও চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের হিসাবে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি রয়েছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে মোট পণ্য রফতানি হয়েছে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে রফতানি বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

একইভাবে সেপ্টেম্বরে বছরওয়ারি রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে রফতানি হয়েছিল ৩৬৩ কোটি ডলারের কিছু কম। তুলনামূলক দুর্বল ভিত্তির কারণে এবার প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বেশি হয়েছে।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের শুরুতে রেমিট্যান্স ও রফতানি দুই খাতেই বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি রয়েছে। তবে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স ও রফতানি কমে যাওয়ার প্রবণতা এবং শিল্পে জ্বালানি সংকট অর্থনীতির জন্য নতুন করে নজর দেওয়ার বিষয় হয়ে উঠেছে।