এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে একদিকে যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে ব্যাংক, অন্যদিকে ব্যাংকের যারা ভালো গ্রাহক তাদেরকেও এর খেসারত দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ বেশি হলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়। ফলে সুদের হারও বৃদ্ধি পায়। এতে ভালো গ্রাহক, যারা সময় মতো ঋণের টাকা ফেরত দেন তারা সমস্যায় পড়ছেন।
অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেলে ঋণে সুদের হার বৃদ্ধি পায়। আর সুদের হার বৃদ্ধি পেলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এর ফলে উদ্যোক্তারা ঋণ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। যার কারণে ব্যাংকে অলস টাকা জমে যায়। আর অলস টাকার পেছনে সুদ গুনতে গিয়ে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ব্যাংক আমানতে সুদ হার কমিয়ে দেয়। সব মিলিয়ে এই খেলাপির দায় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই এসে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সুদের হার বেড়ে গেলে তা সমন্বয় করতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার কমিয়ে দেয়। এর ফলে আমানতকারীরা ক্ষতির মুখে পড়েন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপির পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। এর বাইরে ব্যাংক আগের খেলাপি হওয়া ৪১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৪৮ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণের বিপরীতে কোনও সুদ আয় হয় না ব্যাংকের। বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যবাধকতার কারণে খেলাপি ঋণের বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিভিন্ন হারে প্রভিশন রাখতে হয়। এসব অর্থেও কোনও সুদ আসে না। শুধু মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে সুদ আয় স্থগিত করা হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। আদায় অযোগ্য ঋণ অর্থাৎ মন্দা ঋণের আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় সামনে এর প্রভাব আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের যেমন ক্ষতি তেমনি অর্থনীতির জন্যও ক্ষতি। এ কারণে খেলাপি ঋণ যাতে কমে আসে সে ব্যাপারে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি, বেসরকারি, বিদেশিসহ সব ধরনের ব্যাংক যেসব ঋণ বিতরণ করে, সেগুলোর গুণমান বিবেচনায় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নিরাপত্তা সঞ্চিতি(প্রভিশন) হিসেবে রাখতে হয়। কোনও ঋণ শেষ পর্যন্ত মন্দ ঋণে পরিণত হলে তাতে যেন ব্যাংক আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে না পড়ে, সেজন্য এ নিরাপত্তা সঞ্চিতির বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত সময়ে প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে রাষ্ট্র মালিকানাধীন সোনালী, বেসিক ও জনতা এবং বেসরকারি খাতের বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের নিরাপত্তা সঞ্চিতির ঘাটতির পরিমাণ ৩ হাজার ৬৭৬ কোটি, সোনালী ব্যাংকের ১ হাজার ৬৮৩ কোটি, জনতা ব্যাংকের ২৩০ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ২৪৩ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১৩৯ কোটি ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ৮৮ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংক খাত ছাড়াও অন্যান্য প্রায় সব খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে বিনিয়োগ বাড়ছে না বা বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে না উদ্যোক্তারা। শুধু বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হওয়া নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ঋণের এই উচ্চ সুদের প্রভাব পড়ছে বিভিন্নভাবে। অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। এতে বাড়ছে দ্রব্যমূল্যও। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, ব্যাংকের আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। বড় বড় ব্যবসায়ী বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। কিন্তু পরিশোধ করছেন না। একপর্যায়ে ওই ঋণ খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে। এসব খেলাপি ঋণ নবায়নের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালাও মানা হচ্ছে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্ট না দিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের আশীর্বাদে ঋণ নবায়ন করে নিচ্ছেন অনেকেই। শুধু গত বছরের শেষ সময়ে ১৪টি ব্যবসায়ী গ্রুপ প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের নামে নবায়ন করেছে মাত্র এক ও দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে। এসব ঋণের সুদেও ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে একদিকে ব্যাংকগুলোর মুনাফার পরিমাণ যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি সাধারণ শেয়ার হোল্ডাররাও বছর শেষে প্রকৃত লভ্যাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের বিপরীতে টাকা আটকে যাওয়ায় ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। কারণ, ঋণ আদায় হলে ওই ঋণ আবার ব্যাংক বিনিয়োগ করতে পারে। কিন্তু ঋণ আদায় না হলে ব্যাংকগুলো ওই অর্থ আর পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারে না। এভাবে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যায়। আবার এই মন্দ ঋণের বিপরীতে সুদ স্থগিত করায় ব্যাংকের আয়ও কমে যাচ্ছে।
জানা গেছে, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়া ছাড়াও নামসর্বস্ব সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠানকে বেআইনিভাবে ঋণ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে কিছু ঋণ দেওয়া হয়েছে ভুয়া জামানতের বিপরীতে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান জামানত ছাড়াও ঋণ পেয়েছে। শুধু তাই নয়, জমির মালিকানা নিশ্চিত না হয়েও ঋণ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ব্যাংকিং খাতে এখন দক্ষতার অভাব দেখা দিয়েছে। যার কারণে ভুল যায়গায় ঋণ চলে যাচ্ছে। আর এই ভুল যায়গায় ঋণ দেওয়ার কারণে ব্যাংক ঠিকমতো টাকা ফেরত পাচ্ছে না। আর টাকা সময় মতো ফেরত না আসার কারণে খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। এর ফলে সুদ হার কমছে না। ঋণের উচ্চ সুদ এবং বিভিন্ন চার্জের কারণে ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে। ফলে প্রসার লাভ করতে পারছে না ব্যবসা-বাণিজ্য।
ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ও বাণিজ্যিক সুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং উচ্চ সুদের কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ২০১৫ সালের শেষের দিকে আইএমএফের প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তা রড রিগো অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কাছে এমন মন্তব্য করেন।
/এএইচ/
আরও খবর পড়ুন-