গেল ১০ বছরেরও বেশি সময় পার করেছে দেশের মোবাইল ফিন্যান্সিং সার্ভিসের (এমএফএস) কার্যক্রম। দীর্ঘ এই সময়ে মোবাইলভিত্তিক এ সেবা যেমন দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছেছে। তেমনি দিনে দিনে বেড়েছে এর গ্রাহক সংখ্যা। ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে লেনদেনকে সহজ করেছে এমএফএস, তবে এর চার্জ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে বিস্তর। ভোক্তাদের অনেকেই বলে থাকেন, মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক এই সেবার বিপরীতে ‘গলাকাটা চার্জ’ আরোপ করা হয়েছে। দীর্ঘ এই এক দশকেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে কোনও টুঁ-শব্দ পর্যন্ত করেনি।
ব্যাংকের প্রতিটি সেবার বিপরীতে মাশুল বা চার্জ কত হবে, তা নির্ধারণ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। মোবাইল ফোনভিত্তিক আর্থিক সেবার (এমএফএস) ওপর দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নির্ভরশীল হয়ে পড়লেও এর মাশুল নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে সব সময়ই নীরব দেখা গেছে। সাধারণত ব্যাংকের মাধ্যমে ১ হাজার টাকা লেনদেনে গ্রাহকের যেখানে খরচ পড়ে এক টাকা বা তারও কম, সেখানে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করলে প্রতি হাজারে গ্রাহককে খরচ করতে হচ্ছে ১৮ টাকারও বেশি।
করোনাকালে গড়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা। যাদের লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম এমএফএস। কিন্তু এই বড় অংকের চার্জের কারণে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হতে পারছেন না তারা। কুমিল্লায় কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ উল্লাহ। সারাদেশেই নিজেদের তৈরি করা পণ্য ডেলিভারি দেয় তার প্রতিষ্ঠান। এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আমাদের খুব স্বল্প লাভে পণ্য বিক্রি করতে হয়। কিন্তু টাকা আসার চার্জ সেই লাভের বড় অংশই নিয়ে নেয়।’
শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নয়, দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকসহ দেশের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন করছেন। কিন্তু লেনদেনের ‘অস্বাভাবিক এই চার্জ’ স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য অতিরিক্ত বলেই মনে করেন ভোক্তারা। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এই সেবা শহর ও গ্রামে টাকার প্রবাহ বৃদ্ধি করেছে, শহরের শ্রমজীবী মানুষের আয়ের একটি অংশ মুহূর্তের মধ্যে চলে যাচ্ছে গ্রামে। ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যের লেনদেন হচ্ছে। শুধু তাই নয়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন–ভাতা চলে যাচ্ছে শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে।
দেশে এমএফএস কার্যক্রমের কয়েকবছর পরেই ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা। গত বছরের শেষভাগেই এজেন্ট ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যা ছিল দেড় কোটিরও বেশি। ব্যবহারকারীরা বলছেন, এমএফএসের চেয়ে আরও সহজ ও গ্রাহকবান্ধব হয়ে গ্রাহকের দুয়ারে পৌঁছে গেছে ব্যাংকের হাজার হাজার এজেন্ট আউটলেট। এসব আউটলেট থেকে মুহূর্তেই ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে, আবার মুহূর্তেই বিদেশ থেকে পাঠানো প্রবাসীদের টাকাও পেয়ে যাচ্ছেন তার আত্মীয়-স্বজনরা। এমন পরিস্থিতিতে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো (মোবাইল ব্যাংকিং) নিজেরাই এখন গ্রাহকদের জন্য অর্থ উত্তোলনের খরচ কমাতে শুরু করেছে। ফলে প্রতি হাজার টাকা উত্তোলনের খরচ বা মাশুল ১৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, এতদিন বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এই সেবাকে সবার কাছে জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রে সেবার পাশাপাশি সময় বাঁচানোটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনও গ্রাহক ইচ্ছে করলে সময় বাঁচাতে মোবাইল ব্যাংকিং থেকে সেবা নিতে পারছে। আবার ব্যাংক থেকেও সেবা নেওয়ার সুযোগ আছে। আমরা প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করার চেষ্টা করছি।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সেবার বিপরীতে চার্জ অথবা মাশুল নির্ধারণ করে দেওয়া অনেক সময় দরকার হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তবে কোনও প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের থেকে বাস্তবতার চেয়ে বেশি মাশুল বা চার্জ নিলে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই দেখবে।’
চার্জ বেশির বিষয়ে এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সেবার বিপরীতে আয়ের ৬০ ভাগই দিতে হয় এজেন্টদের। এছাড়া নেটওয়ার্ক খরচ ছাড়াও প্রতিষ্ঠান পরিচালনাতে খরচ হয়।
যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের অফিস ভাড়া, নিয়মিত কর্মীদের বেতন দেন। অন্যদিকে মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালিত হয় ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে সহ-উদ্যোগ হিসেবে। সেকারণে ব্যাংকের চেয়ে খরচ আরও কম হওয়ার কথা। সেখানে উল্টো কয়েকগুণ বেশি খরচ অবশ্য পরিমার্জনের দাবি রাখে।
শুধু অর্থ পাঠানো কিংবা উত্তোলন চার্জই নয়, আরও বিভিন্ন রকম সেবার মাশুল নিচ্ছে এমএফএসগুলো। দেশের অন্যতম শীর্ষ এমএফএস বিকাশ ইতোমধ্যে গ্রাহকদের ঋণ দেওয়ার কার্যক্রমও শুরু করেছে। এছাড়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি বিল পরিশোধ, স্কুলের বেতন, কেনাকাটা, সরকারি ভাতা, টিকিট ক্রয়, বিমার প্রিমিয়াম পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জ ও অনুদান প্রদানের মতো অনেক পরিষেবাই চালু রয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা জমা করতে এখন আর এজেন্টদের কাছেও যেতে হচ্ছে না। ব্যাংক বা কার্ড থেকে সহজেই টাকা আনা যাচ্ছে এসব হিসাবে। আবার এসব হিসাব থেকে ব্যাংকেও টাকা জমা শুরু হয়েছে, ক্রেডিট কার্ড বা সঞ্চয়ী আমানতের কিস্তিও জমা দেওয়া যাচ্ছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দিনে পাঁচ বারে ৩০ হাজার টাকা জমা করা যায়। মাসে ২৫ বারে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা। আর এক দিনে ২৫ হাজার টাকা উত্তোলন ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি হিসাবে পাঠানো যায়। এখন গ্রাহকেরা ঘরে বসে এমএফএস হিসাব খুলতে পারেন। রয়েছে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা স্থানান্তরের সুবিধাও।
দেশে বর্তমানে ১৩টি প্রতিষ্ঠান মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস) দিচ্ছে। গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত গ্রাহকসংখ্যা ১০ কোটি ৯৬ লাখ। তবে সক্রিয় গ্রাহক ৪ কোটি। ওই মাসে গ্রাহকেরা মোট লেনদেন করেছেন ৬৭ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ গ্রাহকেরা গড়ে দৈনিক ২ হাজার ২৬৫ কোটি টাকা লেনদেন করেন।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবার যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের মার্চে। বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক প্রথম এ সেবা চালু করে পরে এটির নাম বদলে করা হয় রকেট। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এমএফএস সেবা চালু করে বিকাশ। ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিকাশের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের খরচ ১৮ টাকা ৫০ পয়সা নেওয়া হচ্ছে।
অবশ্য নতুন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘ট্যাপ’ ও ‘উপায়’ এবং ডাক বিভাগের সেবাদাতা ‘নগদ’ তাদের কার্যক্রম শুরুর সময় থেকেই অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক কম মাশুল নিয়ে আসছে।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় সেবাদাতা ‘বিকাশ’ নির্দিষ্ট একটি এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলনের খরচ কমিয়েছে। আর ‘রকেট’ খরচ কমিয়েছে সব এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলনের মাশুল। চলতি মাসের শুরুতে রকেট সব এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলনের নতুন মাশুল নির্ধারণ করে ১৬ টাকা ৭০ পয়সা।
এ প্রসঙ্গে ডাচ্–বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম মো. শিরিন বলেন, ‘সবাই খরচ কমাচ্ছে। এ জন্য আমরাও রকেটের সেবায় খরচ কমিয়ে দিয়েছি।’
রকেটের পরে দেশে বিকাশ এলেও বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশ শুরু থেকেই এক হাজার টাকা উত্তোলনের বিপরীতে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা খরচ নিয়ে আসছে। অবশ্য যাত্রার ১০ বছর উপলক্ষে গত বছরের অক্টোবরে বিকাশ নির্দিষ্ট এজেন্ট নম্বর থেকে প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের বিপরীতে মাশুল হাজারে ১৪ টাকা ৯০ পয়সায় নির্ধারণ করেছে। বিকাশের এখন ৫ কোটি ৮৫ লাখ গ্রাহক রয়েছে, গড়ে প্রতিদিন লেনদেন হয় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
এদিকে ডাক বিভাগের সেবা নগদের যাত্রা শুরুর পর থেকেই সব এজেন্ট থেকে টাকা উত্তোলনে প্রতি হাজারে ১৪ টাকা ৯৪ পয়সা খরচ নেওয়া হচ্ছে। তবে অ্যাপের মাধ্যমে টাকা উত্তোলন করলে গ্রাহকের প্রতি হাজারে খরচ পড়ে ১১ টাকা ৪৯ পয়সা। আর নতুন করে প্রতিযোগিতায় আসা ট্যাপ শুরু থেকেই অ্যাপের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনে ১৪ টাকা ৭০ পয়সা নিচ্ছে। ইউসিবির সেবা উপায় এজেন্টে ১৪ টাকা ও ইউসিবি এটিএম থেকে অর্থ উত্তোলনে ৮ টাকা খরচ নিচ্ছে। ওয়ান ব্যাংকের সেবা ওকে ওয়ালেট এজেন্টে প্রতি হাজারে ১৮ টাকা ।