দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে গঠিত পাঁচ বছর মেয়াদি এই তহবিলের আওতায় কৃষক ও গ্রামীণ উদ্যোক্তারা স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন।
এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ সোমবার (৮ জুন) রাতে একটি পরিপত্র জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে।
পরিপত্র অনুযায়ী, প্রকৃত চাষি, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষি এবং নারী কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হবে। কৃষকদের পরিচয় ও যোগ্যতা যাচাইয়ে স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অথবা সরকারের কৃষক কার্ড ব্যবহার করা হবে।
জামানত ছাড়াই ঋণ সুবিধা
নতুন স্কিমের আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা শস্য ও ফসলের দায়বদ্ধতার বিপরীতে কোনো ধরনের স্থাবর জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষেত্রে স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা দলভিত্তিক সামাজিক জামানত গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি ব্যক্তি এই স্কিমের আওতায় ঋণ সুবিধা পাবেন না। এছাড়া এই ঋণের অর্থ পুরোনো ঋণ পরিশোধ বা সমন্বয়ের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ তিনবার এই তহবিলের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
বিভিন্ন খাতে ঋণের সীমা নির্ধারণ
স্কিমের আওতায় কৃষি ও পল্লি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ঋণ বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে— মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা, শস্য ও ফসল উৎপাদনে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা, কৃষিযন্ত্রপাতি ক্রয়ে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা, আয়বর্ধক কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য পল্লি ঋণে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা, ঋণের অর্থ সর্বোচ্চ পাঁচ একর জমিতে কৃষিকাজ পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা যাবে।
কৃষক পর্যায়ে সুদ ৮ শতাংশ
বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এই তহবিল থেকে ৪ শতাংশ সুদে অর্থ সরবরাহ করবে। ব্যাংকগুলো কৃষক বা গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ সরল সুদে ঋণ বিতরণ করতে পারবে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও মুনাফার হার ৮ শতাংশের বেশি নির্ধারণ করা যাবে না।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য তহবিল
১০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিল পুনর্ব্যবহারযোগ্য (রিভলভিং) ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ, ঋণের কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে ফেরত আসা অর্থ পুনরায় নতুন ঋণ হিসেবে বিতরণ করা যাবে।
ব্যাংকগুলোর বার্ষিক কৃষিঋণ বিতরণের সক্ষমতা ও চাহিদার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তহবিল বরাদ্দ করবে। বরাদ্দ পাওয়ার এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে।
১৮ মাসে ঋণ পরিশোধ
কৃষক পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ১৮ মাস। খাতভেদে সর্বোচ্চ তিন মাসের গ্রেস পিরিয়ডও দেওয়া হবে।
তবে কৃষকদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিতরণকারী ব্যাংকের ওপরই থাকবে। কৃষক ঋণ পরিশোধ করুক বা না করুক, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুদাসলে ফেরত দিতে হবে।
অনিয়মে জরিমানার বিধান
পরিপত্রে বলা হয়েছে, কোনও ব্যাংক যদি নির্ধারিত ৮ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করে বা তহবিলের অপব্যবহার করে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে জরিমানা আরোপ করবে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ফেরত না দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বাংলাদেশ ব্যাংকে সংরক্ষিত চলতি হিসাব থেকে অর্থ সমন্বয় করে নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, নতুন এই পুনঃঅর্থায়ন তহবিল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণ এবং দেশের বিস্তৃত জনপদের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।