বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করলো এসঅ্যান্ডপি 

দেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌম ঋণমানের (সোভরেন ক্রেডিট রেটিং) পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস। 

সোমবার (২৭ জুলাই) প্রকাশিত এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, আর্থিক খাতে ভারসাম্যহীনতা, সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। এসব কারণে আগামী সময়ে অর্থনীতির ঝুঁকি বেড়েছে। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখনও তুলনামূলক কম। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা দুর্বল এবং সরকারের সুদ ব্যয় বেশি হওয়ায় আর্থিক নমনীয়তা সীমিত। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জও দেশের ঋণমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

এসঅ্যান্ডপির মতে, দেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করবে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, তৈরি পোশাক রফতানির পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর অব্যাহত সহায়তার ওপর। 

এর আগে চলতি বছরের মে মাসে আরেক আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা ফিচ রেটিংসও বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ করেছিল। তখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। 

আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে ঝুঁকি বাড়তে পারে

এসঅ্যান্ডপি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ব্যাংকিং খাতের ভারসাম্যহীনতা এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে। এতে রফতানি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হতে পারে। 

সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যদি আগামী দুই থেকে তিন বছরে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি একই আয়ের অন্যান্য দেশের পর্যায়ে নেমে আসে অথবা বৈদেশিক অবস্থানের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে, তাহলে দেশের সার্বভৌম ঋণমান আরও কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। 

বিশেষ করে চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ঘাটতি বাড়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি না পাওয়া কিংবা বৈদেশিক ঋণের চাপ বেড়ে গেলে রেটিংয়ের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। 

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ 

এসঅ্যান্ডপি আগামী তিন বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কারণে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে কম থাকতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।  

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকটের পর দেশের অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। একই সময়ে খেলাপি ঋণের চাপ সামাল দিতে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের পুনর্গঠন চলছে, যা স্বল্পমেয়াদে আর্থিক খাতে চাপ তৈরি করছে। 

মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটও উদ্বেগ 

এসঅ্যান্ডপির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চ মূল্য ব্যক্তিগত ভোগব্যয় ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার পুনরুদ্ধারকে ধীর করে দিতে পারে।

তবে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখনও কম উৎপাদন ব্যয় ও পর্যাপ্ত শ্রমশক্তির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। যদিও বৈশ্বিক চাহিদার মিশ্র প্রবণতার কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি প্রত্যাশামতো গতি পায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিও নতুন চ্যালেঞ্জ

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রফতানির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করে। এর ফলে বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। 

এসঅ্যান্ডপি মনে করছে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ধীরগতি এখনও বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে। 

সংস্থাটি বলেছে, ভবিষ্যতে বৈদেশিক খাতের উন্নতি অনেকটাই নির্ভর করবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা এবং ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বাড়লেও জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে সেই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।