দক্ষিণ এশিয়ায় চমক দেখালো টাকা

দক্ষিণ এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর অধিকাংশ মুদ্রা যখন গত এক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়েছে, তখন ব্যতিক্রমী স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে বাংলাদেশি মুদ্রা টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। একই সময়ে ভারতের রুপিসহ অঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রধান মুদ্রার দরপতন হয়েছে কয়েক গুণ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কার্যকর ব্যবস্থাপনা, রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের ফলে টাকার ওপর চাপ তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; বরং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। তবে এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে রফতানি ও রেমিট্যান্সের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাপনাও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে সবচেয়ে বেশি অবমূল্যায়নের শিকার হয়েছে ভারতের রুপি। ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রার মান কমেছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার রুপির অবমূল্যায়ন হয়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ, ফিলিপাইনের পেসোর ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়ার ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল শুধু কম্বোডিয়া। দেশটির মুদ্রার অবমূল্যায়ন হয়েছে মাত্র ০ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

অন্যদিকে চীনের ইউয়ান ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী মুদ্রা। একই সময়ে ডলারের বিপরীতে ইউয়ানের মান বেড়েছে ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ। পাকিস্তানি রুপিও সামান্য শক্তিশালী হয়ে ০ দশমিক ৩৯ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন স্থিতিশীল থাকলো টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্ত অনুযায়ী বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু করা হয়। শুরুতে এ নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা থাকলেও পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রাবাজারে তদারকি জোরদার করে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনায় বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়।

এর ফলে একদিকে বাজারে অস্থিরতা কমেছে, অন্যদিকে ডলারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। ফলে বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে।

রেমিট্যান্স ও রফতানি দিয়েছে বড় সহায়তা

টাকার স্থিতিশীলতার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয় ও রফতানি আয় বৃদ্ধি।

গত এক বছরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাতেও আয় বেড়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ শক্তিশালী হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (বিপিএম-৬) অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এক বছর আগে একই সময়ে এ রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৬ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্লেষকদের মতে, রিজার্ভ শক্তিশালী হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে বাজারে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে। এতে হঠাৎ ডলারের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ইতিবাচক প্রভাব

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলে এর সুফল শুধু বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি, খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতিসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা কমানো সম্ভব হয়।

একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ ব্যয় সম্পর্কে তুলনামূলক নিশ্চিত থাকতে পারেন, যা বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করে।

তবে চাপ আবারও বাড়ছে

যদিও গত এক বছরে টাকা উল্লেখযোগ্য স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের চাহিদা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে আমদানি বিল পরিশোধের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দাম ধীরে ধীরে বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১২৩ দশমিক ৮১ টাকা। কয়েক দিন আগেও এ হার ছিল ১২৩ দশমিক ৬৯ টাকা।

যদিও এই বৃদ্ধি খুব বেশি নয়, তবুও এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন করে কিছু চাপ তৈরি হচ্ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আগামী মাসগুলোতে ডলারের চাহিদা আরও বাড়াতে পারে।

এ কারণে টাকার বর্তমান স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, টাকার বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকা দেশের রফতানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। গত কয়েক বছরে বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে রফতানিকারকদের উৎপাদন ব্যয়, মূল্য নির্ধারণ এবং ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাস্তবায়নে নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে বর্তমান স্থিতিশীলতা ব্যবসায়িক পরিকল্পনা গ্রহণে কিছুটা স্বস্তি এনে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজারে এখন প্রতিযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলেই হবে না, উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ, অবকাঠামো, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মুদ্রার স্থিতিশীলতার সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হবে না।

মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করেছে, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে এই অর্জন ধরে রাখতে হলে রফতানি বাজার ও পণ্যের বহুমুখীকরণে আরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদন, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং শিল্পে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন আরও বাড়বে এবং টাকার স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা সহজ হবে।

তিনি বলেন, একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল বিনিময় হার বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা বাড়ায় এবং রপ্তানিকারকদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করে। তবে এই স্থিতিশীলতা যেন কৃত্রিমভাবে নয়, বরং শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারভিত্তিক কার্যকর নীতির মাধ্যমে টেকসইভাবে বজায় থাকে—সেদিকেই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

ইতিবাচক বার্তা, তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের তুলনায় বাংলাদেশি টাকা এখনো অনেক বেশি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা।

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সাফল্য ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন, আমদানি ব্যয়ের চাপ কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বেড়ে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। তাই রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।