বন্ধ হতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের টাকা ফেরত পাবেন কীভাবে

দীর্ঘদিন ধরে আমানত ফেরত দিতে না পারা ও আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা হারানো চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করে রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিয়োগ বাতিল করে প্রতিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তের ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এসব প্রতিষ্ঠানে টাকা রাখা আমানতকারীরা তাদের জমানো অর্থ কীভাবে ফেরত পাবেন? কত টাকা ফেরত পাবেন? আর পুরো টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগই বা কতটা?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাঁচটি সংকটাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য এ কাজে সরকার প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়, সম্পদ বিক্রি এবং অন্যান্য পাওনা আদায়ের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে আমানতকারীদের বাকি অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠান অকার্যকর ঘোষণা করা হলেও আমানতকারীদের টাকা একবারে হারিয়ে যাচ্ছে না। বরং নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পদ ও দায়ের হিসাব করে ধাপে ধাপে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে।

যে চার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক

বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর বা ‘নন-ভায়েবল’ ঘোষণা করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড; ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড; এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।

রেজল্যুশন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একজন করে অস্থায়ী প্রশাসক এবং দুজন করে সহযোগী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চার প্রতিষ্ঠানে মোট ১২ জন কর্মকর্তা এখন প্রশাসন, ব্যবস্থাপনা ও রেজল্যুশন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আগের ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। এখন আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের স্বার্থ সংরক্ষণ, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ রক্ষা, দায়-দেনার হিসাব নির্ধারণ এবং অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে প্রশাসকদের ওপর।

কেন অকার্যকর ঘোষণা করা হলো?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করেই অকার্যকর ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি, বিপুল পরিমাণ শ্রেণিকৃত ঋণ বা বিনিয়োগ, তারল্য সংকট, আয় ক্ষমতার অবনতি এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারের দায় পরিশোধে অক্ষমতা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত বেশি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ১০০ শতাংশ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে সরাসরি অবসায়নের পরিবর্তে নতুন রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় এনে সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থ ফেরতের পথ তৈরি করা হচ্ছে।

আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন কীভাবে?

এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সহজভাবে বললে, টাকা ফেরতের প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে এগোবে।

প্রথম ধাপ: ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তি আমানতকারীর হিসাবে ৬ লাখ টাকা থাকলে তিনি প্রথম ধাপেই সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন। আবার কারও হিসাবে ১০ লাখ টাকার বেশি থাকলে প্রথম ধাপে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত পাওয়ার সুযোগ থাকবে। বাকি অর্থ পরবর্তী ধাপে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—১০ লাখ টাকা কোনও আমানতকারীর মোট পাওনার চূড়ান্ত সীমা নয়; এটি প্রথম ধাপে অর্থ ফেরতের সীমা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তাই কারও ১৫ লাখ, ২০ লাখ বা তার বেশি টাকা জমা থাকলে প্রথম ধাপে ১০ লাখ টাকা পাওয়ার পর বাকি অর্থ নিয়ে পরবর্তী রেজল্যুশন কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ: খেলাপি ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রি

প্রথম ধাপে সরকারি অর্থ দিয়ে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের পর পরবর্তী পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব সম্পদ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হবে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উৎস হবে খেলাপি ঋণ আদায়। বছরের পর বছর এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হলেও তার বড় অংশ আর ফেরত আসেনি। এখন প্রশাসকদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে এসব ঋণ শনাক্ত করা, আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে আইনগত পদক্ষেপের মাধ্যমে পাওনা উদ্ধার করা।

একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের জমি, ভবন, বিনিয়োগ, অন্যান্য সম্পদ এবং যেসব অর্থ বা সম্পদ প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা রয়েছে, সেগুলোও মূল্যায়ন ও ব্যবস্থাপনার আওতায় আসবে।

অর্থাৎ, অমানতকারীদের টাকা ফেরতের জন্য মূলত প্রতিষ্ঠানের সম্পদকে নগদ অর্থে রূপান্তর করা হবে।

তৃতীয় ধাপ: উদ্ধার হওয়া অর্থ আমানতকারীদের মধ্যে বণ্টন খেলাপি ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা প্রতিষ্ঠানের মোট দায়ের বিপরীতে হিসাব করা হবে।

এরপর আইন ও রেজল্যুশন কাঠামো অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। ব্যক্তি আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফলে প্রথম ধাপে ১০ লাখ টাকা পাওয়ার পরও যদি কোনও আমানতকারীর অতিরিক্ত অর্থ পাওনা থাকে, তাহলে পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অর্থের ভিত্তিতে সেই বাকি অর্থ ফেরতের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে এখানে একটি বাস্তবতা রয়েছে—প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও আদায়যোগ্য অর্থ যতটা, শেষ পর্যন্ত ফেরতের পরিমাণও তার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করবে।

পুরো টাকা কি ফেরত পাওয়া যাবে?

এটি নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ রয়েছে। সোজা উত্তর হলো—প্রথম ধাপে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ফেরতের পরিকল্পনা থাকলেও এর অর্থ এই নয় যে ১০ লাখ টাকার বেশি আমানত পুরোপুরি অনিশ্চিত বা হারিয়ে যাবে। আবার পুরো অর্থ দ্রুত ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তাও এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ ঋণ খেলাপি। ঋণের কতটা আদায় করা যাবে, সম্পদ বিক্রি করে কত টাকা পাওয়া যাবে এবং অন্যান্য পাওনা কতটা উদ্ধার করা সম্ভব হবে—তার ওপর পরবর্তী অর্থ ফেরতের পরিমাণ নির্ভর করবে।

অর্থাৎ, কোনও আমানতকারীর ২০ লাখ টাকা জমা থাকলে প্রথম ধাপে ১০ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার পর বাকি ১০ লাখ টাকা ফেরত আসবে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও ঋণ আদায় থেকে কত অর্থ পাওয়া যাচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে।

এ ক্ষেত্রে আমানতকারীদের ধৈর্য ধরতে হবে। কারণ দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে সম্পদ উদ্ধার ও ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হতে পারে।

ব্যক্তি আমানত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা

অবসায়ন বা রেজল্যুশনের আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩ কোটি টাকা। অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও এসব প্রতিষ্ঠান অর্থ নিয়েছে।

পিপলস লিজিংয়ে মোট আমানত প্রায় ৩ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত প্রায় ১ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা।

ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে মোট আমানত প্রায় ৩ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। ব্যক্তি আমানত প্রায় ৬৪৬ কোটি টাকা।

আভিভা ফাইন্যান্সে মোট আমানত প্রায় ৫ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত প্রায় ৮১০ কোটি টাকা।

এফএএস ফাইন্যান্সে মোট আমানত প্রায় ৩৮৯ কোটি টাকা। ব্যক্তি আমানত প্রায় ১০৫ কোটি টাকা।

ফারইস্ট ফাইন্যান্সে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যক্তি আমানত প্রায় ৩৬ কোটি টাকা।

এই হিসাব দেখাচ্ছে, সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অঙ্কের দায় থাকলেও ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

২ লাখ টাকা, ৫ লাখ টাকা আর ৫০ লাখ টাকার আমানতকারীর ক্ষেত্রে কী হবে?

রেজল্যুশন প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য কয়েকটি উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ।

কারও আমানত ২ লাখ টাকা হলে:

প্রথম ধাপে তিনি পুরো ২ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার আওতায় আসতে পারেন।

কারও আমানত ৮ লাখ টাকা হলে:

প্রথম ধাপে পুরো ৮ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকবে।

কারও আমানত ১০ লাখ টাকা হলে:

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম ধাপে পুরো ১০ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার কথা।

কারও আমানত ২৫ লাখ টাকা হলে:

প্রথম ধাপে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পাওয়ার পর বাকি ১৫ লাখ টাকা পরবর্তী ধাপে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও ঋণ আদায়ের অর্থ থেকে ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে।

কারও আমানত ১ কোটি টাকা হলে:

প্রথম ধাপে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। বাকি ৯০ লাখ টাকা পরবর্তী রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানের উদ্ধারযোগ্য সম্পদের ওপর নির্ভর করবে।

তবে এগুলো নীতিগত কাঠামো বোঝানোর উদাহরণ। বাস্তবে অর্থ ছাড়ের পদ্ধতি, সময়সূচি, দাবির যাচাই ও চূড়ান্ত বণ্টন সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংক ও প্রশাসকদের পরবর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

আমানতকারীদের এখন কী করতে হবে?

এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আতঙ্কিত হয়ে আমানতের কাগজপত্র বা হিসাবের তথ্য হারিয়ে না ফেলা।

অমানতকারীদের উচিত—

প্রথমত, আমানত হিসাবের কাগজপত্র, হিসাব বিবরণী, মেয়াদি আমানতের সনদ, টাকা জমার রসিদ, চেক বা অন্যান্য প্রমাণপত্র সংরক্ষণ করা।

দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজের পাওনার সঠিক হিসাব মিলিয়ে রাখা।

তৃতীয়ত, প্রশাসক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দাবি দাখিল, যাচাই বা অর্থ উত্তোলনের বিষয়ে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, তা অনুসরণ করা।

চতুর্থত, কোনও দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে না পড়া। অর্থ ফেরতের সরকারি প্রক্রিয়ায় অননুমোদিত ব্যক্তিকে টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।

পঞ্চমত, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসকের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির বাইরে কোনও গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর না করা।

আমানত বীমার ২ লাখ টাকা আর নতুন ১০ লাখ টাকার পরিকল্পনা—পার্থক্য কোথায়?

বিদ্যমান ব্যবস্থায় কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন হলে আমানত বীমা ব্যবস্থার আওতায় একজন আমানতকারী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ পান। এর বেশি অর্থ ফেরতের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ উদ্ধার, ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রির ওপর নির্ভর করতে হয়।

কিন্তু এবার সংকটাপন্ন পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ফলে এটি সাধারণ আমানত বীমার সীমার তুলনায় আলাদা একটি বিশেষ ব্যবস্থা। উদ্দেশ্য হচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে টাকা আটকে থাকা ছোট ও ব্যক্তি আমানতকারীদের দ্রুত কিছুটা স্বস্তি দেওয়া এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা।

পিপলস লিজিংয়ের টাকা ফেরতেও একই উদ্যোগ

অবসায়নের চূড়ান্ত তালিকায় থাকা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ আদালতের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ায় সেখানে প্রশাসক নিয়োগের আগে আইনি জটিলতা কাটাতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ওই পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছে। আদালতের সিদ্ধান্তের পর প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও চার প্রতিষ্ঠানকে সময়

এদিকে সব সংকটাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এখনই বন্ধ করে দিচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। চারটি প্রতিষ্ঠানকে পরিস্থিতি উন্নতির জন্য সময় দেওয়া হয়েছে।

এগুলো হলো—বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি এবং প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হলে তাদেরও পরবর্তী সময়ে রেজল্যুশন বা অবসায়নের আওতায় আনা হতে পারে।

সংকট থেকে আমানতকারী সুরক্ষায় নতুন পরীক্ষার শুরু

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানের কারণে আমানতকারীদের অর্থ আটকে থাকার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬-এর আওতায় চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করে প্রশাসক নিয়োগের ঘটনা নতুন কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

এই ব্যবস্থার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—আমানতকারীদের দ্রুত প্রথম ধাপের অর্থ ফেরত, খেলাপি ঋণ কার্যকরভাবে আদায় এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদ স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা।

বিশেষ করে যেসব ঋণ বছরের পর বছর আদায় হয়নি, সেগুলো আদায়ে প্রশাসকদের কতটা কার্যকর ভূমিকা থাকে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে প্রথম ধাপে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দিলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। বাকি অর্থ ফেরত দিতে হলে খেলাপি ঋণ ও সম্পদ উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ায় আমানতকারীদের যেন আবার দীর্ঘ অপেক্ষায় পড়তে না হয়। প্রথম ধাপে দ্রুত অর্থ ফেরতের পাশাপাশি পরবর্তী ধাপের জন্য স্পষ্ট সময়সূচি, সম্পদ ও ঋণের স্বচ্ছ হিসাব এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ করা গেলে আমানতকারীদের আস্থা অনেকটাই ফিরতে পারে।

অর্থাৎ, চারটি প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করা আসলে আমানতকারীদের অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ার ঘোষণা নয়। বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমের পরিবর্তে এখন নিয়ন্ত্রিত ও আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পদ-দায় নিষ্পত্তি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। প্রথম ধাপে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত, এরপর ঋণ আদায় ও সম্পদ বিক্রি করে পর্যায়ক্রমে বাকি অর্থ ফেরত—এই পথেই এগোবে পুরো প্রক্রিয়া।

তবে শেষ পর্যন্ত একজন আমানতকারী তার মোট পাওনার কত অংশ এবং কত সময়ে ফেরত পাবেন, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদ, খেলাপি ঋণ আদায়ের সাফল্য এবং রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার দক্ষতার ওপর।