দেশের অর্থনীতিতে নানা চ্যালেঞ্জ ও ব্যাংক খাতে অস্থিরতার মধ্যেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বড় অঙ্কের নিট মুনাফা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা বেশি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মূল বেতনের ছয় গুণের সমপরিমাণ ‘পারফরম্যান্স বোনাস’ বা প্রণোদনা বোনাস অনুমোদন করা হয়েছে। অর্থাৎ, কর্মকর্তারা মূল বেতনের ছয় মাসের সমপরিমাণ অর্থ বোনাস হিসেবে পাবেন।
রবিবার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত আর্থিক বিবরণী অনুমোদন করা হয়। একই বৈঠকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রণোদনা বোনাস অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা বেড়েছে ৩ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট বা স্থূল মুনাফা ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। ওই বছর নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিয়ে বড় সুদ আয়
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত অর্থবছরে ব্যাংক খাতে তারল্যসংকটের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ধার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন তারল্য চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া এসব ঋণের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সুদ আয় হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একটি অংশ বিভিন্ন দেশে এবং আন্তর্জাতিক বন্ডে বিনিয়োগ করা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকায় এসব বিনিয়োগ থেকেও গত অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য আয় হয়েছে।
ফলে একদিকে ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেওয়ার বিপরীতে সুদ আয় এবং অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগ থেকে আয়—দুইয়ের প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কাজ মুনাফা করা নয়’
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বড় অঙ্কের মুনাফাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের কেউ কেউ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য মুনাফা করা নয়। ব্যাংক খাতের তদারকি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তিনি বলেন, মূলত অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতার কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে। তবে মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষার মূল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত না হয়, সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
সরকারের কোষাগারে যাবে মুনাফার বড় অংশ
পর্ষদ সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্জিত নিট মুনাফার একটি বড় অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি পূরণে কিছুটা সহায়তা হবে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বৃদ্ধির এই চিত্রকে শুধু আর্থিক সাফল্য হিসেবে না দেখে এর পেছনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ব্যাংক খাতে তারল্যসংকট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মুনাফা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হওয়ায় এ নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখার প্রয়োজন রয়েছে।