সর্বজনীন পেনশনে মুনাফা ১১.৭২ শতাংশ, নমিনির পেনশন ৮০ বছর পর্যন্ত

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে পেনশনারের মৃত্যুর পর নমিনিকে পেনশন দেওয়ার বয়সসীমা ৭৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের (এনপিএ) পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনার পাশাপাশি গ্রাহকদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা এবং স্কিমে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে বেশ কিছু প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করা হয়।

মুনাফা বাড়ল

সভায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় বিনিয়োগ করা অর্থের বিপরীতে গ্রাহকদের মুনাফা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের জন্য মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণের অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর ফলে ওই অর্থবছরে বিনিয়োগ করা অর্থের বিপরীতে নির্ধারিত হারে মুনাফা গ্রাহকদের পেনশন হিসাবে যুক্ত হবে। এর আগে মুনাফার হার ছিল ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, বিনিয়োগের সুফল গ্রাহকদের হিসাবে যুক্ত করার মাধ্যমে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নমিনির পেনশন ৮০ বছর পর্যন্ত

সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব করতে পেনশনারের মৃত্যুর পর নমিনিকে পেনশন দেওয়ার বয়সসীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বর্তমানে ৭৫ বছর পর্যন্ত নমিনি পেনশন পাওয়ার সুযোগ থাকলেও তা বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে পেনশনারের মৃত্যুর পর তার ওপর নির্ভরশীল নমিনি আগের তুলনায় আরও দীর্ঘ সময় পেনশনের সুবিধা পাবেন।

চালু হতে পারে ইসলামিক ভার্সন

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের ইসলামিক বা শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পেয়েছে।

বর্তমানে চালু থাকা প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা—এই চার স্কিমের শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব স্কিম পরিচালনার সুযোগ তৈরি করা গেলে ধর্মীয় কারণে প্রচলিত পেনশন ব্যবস্থায় অংশ না নেওয়া মানুষের একটি অংশকেও সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর টাকা তোলার সুযোগ

চাঁদাদাতাদের বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ন্যূনতম পাঁচ বছর চাঁদা জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত শর্তে পেনশন হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ একটি প্রস্তাব পরবর্তী পর্যায়ে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব

সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নতুন গ্রাহক বাড়াতে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবও সভায় আলোচনা হয়েছে।

বর্তমানে একজন গ্রাহক নিবন্ধনের জন্য ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে ১৫ টাকা কমিশন দেওয়া হয়। এই কমিশন বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।

একই সঙ্গে ব্যাংক, ডাক বিভাগ ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের জন্য কমিশন নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

স্বাস্থ্যবিমা চালুর আলোচনা

সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় গ্রাহকদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে।

পেনশন সুবিধার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো অতিরিক্ত সুবিধা যুক্ত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

সভায় আগের বৈঠকে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও টেকসই, কার্যকর ও গ্রাহকবান্ধব করতে আলোচনার পর সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার আওতায় আনার লক্ষ্যেই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে। গ্রাহকদের আস্থা বাড়ানো, বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করা এবং নতুন সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করার মাধ্যমে এ ব্যবস্থার পরিধি আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সভায় অর্থ সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।