টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেনে নতুন সুযোগ, ভস্ট্র অ্যাকাউন্টে বাড়লো সুবিধা

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের স্থানীয় মুদ্রা টাকা ব্যবহারের সুযোগ আরও বাড়াতে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন বিদেশি ট্রেডিং পার্টনার ব্যাংকের নামে কোনও প্রারম্ভিক জমা ছাড়াই ‘টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট’ খোলা ও পরিচালনা করা যাবে। এর মাধ্যমে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের লেনদেন স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১ থেকে এ-সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করা হয়। সার্কুলার নং-৩৮ দেশের সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মো. আবু বক্কার সিদ্দিক সই করেছেন।

প্রারম্ভিক জমা ছাড়াই খোলা যাবে ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সহজ করতে বিদেশি ট্রেডিং পার্টনার ব্যাংকের নামে ‘টাকা ভস্ট্র অ্যাকাউন্ট’ খোলা ও পরিচালনা করা যাবে। এ ধরনের হিসাব খোলার সময় কোনো প্রারম্ভিক জমা রাখার প্রয়োজন হবে না।

বিদেশি ব্যাংকের নামে স্থানীয় ব্যাংকে খোলা এ হিসাবে বাংলাদেশের টাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনের অর্থ রাখা ও নিষ্পত্তি করা যাবে। ফলে আমদানি-রফতানি লেনদেনে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে।

এলসি ও ইনভয়েস করা যাবে বৈদেশিক মুদ্রায়

সার্কুলারে বলা হয়েছে, আমদানি-রফতানির এলসি, চুক্তি ও ইনভয়েস অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রায় করা যাবে। তবে লেনদেন নিষ্পত্তির সময় সংশ্লিষ্ট অর্থ প্রচলিত বিনিময় হারে টাকায় রূপান্তর করতে হবে।

অর্থাৎ বাণিজ্যিক চুক্তিতে ডলার বা অন্য কোনও অবাধে রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি টাকায় করা যাবে। এতে বাণিজ্যিক লেনদেনে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের পরিধি বাড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক একই সঙ্গে অংশীদার দেশের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ব্যাংকিং নথিপত্র আদান-প্রদান ও যোগাযোগ নিরাপদ, দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে।

আমদানিকারকদের লেনদেন হবে স্থানীয় ব্যাংকিং চ্যানেলে

নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, আমদানিকারকদের স্থানীয় ব্যাংকিং চ্যানেল অথবা সংশ্লিষ্ট ভস্ট্র অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন নিষ্পত্তি করতে হবে। নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এসব হিসাবের বিপরীতে ওভারড্রাফট সুবিধাও দেওয়া যাবে।

এর ফলে বিদেশি অংশীদার ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক লেনদেন পরিচালনার সুযোগ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

ভস্ট্র অ্যাকাউন্টের অর্থ বিনিয়োগও করা যাবে

নতুন নির্দেশনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিদেশি ব্যাংকের ভস্ট্র অ্যাকাউন্টে থাকা উদ্বৃত্ত অর্থ বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ওই অর্থ সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই), পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট, অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং ওপেন-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করা যাবে।

এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ কিংবা বিদেশে রেমিট্যান্স হিসেবেও ভস্ট্র অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থ পাঠানো যাবে।

ফলে বিদেশি অংশীদার ব্যাংকের নামে খোলা এসব হিসাবে থাকা অর্থ শুধু আমদানি-রপ্তানি নিষ্পত্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; নির্দিষ্ট শর্তে দেশের বিনিয়োগ ও অন্যান্য বৈধ আর্থিক লেনদেনেও ব্যবহার করা যাবে।

মানতে হবে বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা বিধি

টাকায় আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ বাড়ানো হলেও বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, আমদানি ও রপ্তানি লেনদেনের ক্ষেত্রে যথাক্রমে আইএমপি ও এক্সপি ফর্মসংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিবিধান যথাযথভাবে পরিপালন করতে হবে।

একই সঙ্গে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে (এএমএল বা সিএফটি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রাহকের পরিচয় ও তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ‘নো ইউর কাস্টমার’ বা কেওয়াইসি নীতিও কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয় এমন মুদ্রার ক্ষেত্রেও সুযোগ

যেসব দেশের স্থানীয় মুদ্রা অবাধে রূপান্তরযোগ্য নয়, সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও নতুন নির্দেশনায় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিয়ে এসব দেশের সঙ্গে লেনদেন নিষ্পত্তির জন্য বিদেশি নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট বজায় রাখা যাবে। ফলে যেসব দেশের মুদ্রা আন্তর্জাতিকভাবে সহজে রূপান্তরযোগ্য নয়, তাদের সঙ্গে বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে লেনদেনের সুযোগ থাকবে।

টাকায় বাণিজ্যের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় অংশ এখনো ডলারসহ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। ফলে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা তৈরি হয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের ওপর চাপ পড়ে।

এ অবস্থায় স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়ানো হলে নির্দিষ্ট কিছু দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি রয়েছে, তাদের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক হিসাব ব্যবস্থার মাধ্যমে বাণিজ্য নিষ্পত্তি সহজ হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা মূলত টাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক লেনদেনের কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করেছে। একই সঙ্গে ভস্ট্র অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থের ব্যবহার, বিনিয়োগ ও নিষ্পত্তির বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ায় এ ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগও বাড়ল।