বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির গতি কমার প্রভাব এবার আরও স্পষ্টভাবে পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রায়। কমেছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কমেছে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। সব মিলিয়ে নতুন করে দরিদ্র হচ্ছেন দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে অনেক নারী কাজ হারিয়ে শ্রমবাজার থেকে সরে গেছেন।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতি ও দারিদ্র্যের এই চিত্র উঠে এসেছে। ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতির গতি দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা আপাতত কম।
দরিদ্র হচ্ছেন কারা?
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, নতুন করে দারিদ্র্যে পড়া মানুষের বড় অংশ এমন পরিবার, যাদের আয় কমেছে বা কর্মসংস্থান হারিয়েছে এবং যারা উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে পারছে না। অর্থনীতির ধীরগতিতে নতুন চাকরি তৈরি কমেছে। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। কাজ হারানো নারীদের অনেকে আর শ্রমবাজারে ফিরতে পারেননি। ফলে যেসব পরিবার একসময় দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে ছিল, আয় কমে যাওয়ায় তাদের একটি অংশ আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক হিসাবে, দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে উঠেছে। এতে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে ওই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন।
জাতীয় দারিদ্র্যসীমাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২২ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। অর্থাৎ দারিদ্র্য এখন শুধু চরম দরিদ্র মানুষের সমস্যা নয়; নিম্নআয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের একটি অংশও ধীরে ধীরে ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
আয় বাড়ছে না, খরচ বাড়ছে
দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া ব্যবধান। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে এলেও মানুষের জন্য স্বস্তি ফেরেনি। কারণ মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে।
খাদ্য, পরিবহন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চ মূল্য মানুষের সংসার খরচ বাড়িয়েছে। অপরদিকে নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি সেই হারে বাড়েনি। ফলে প্রকৃত আয় কমেছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, মানুষের আয় যদি ৮ শতাংশ বাড়ে কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় ১০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বাংলাদেশে নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের চাপই এখন দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
কাজ নেই, বিনিয়োগ নেই
কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় দারিদ্র্য কমানোর প্রচলিত পথও দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পণ্য ও সেবার প্রকৃত রফতানিও কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
অর্থাৎ নতুন কারখানা ও ব্যবসা কম হচ্ছে, বিদ্যমান অনেক প্রতিষ্ঠানও উৎপাদন বাড়াতে পারছে না। ফলে শ্রমবাজারে নতুন চাকরি তৈরির সুযোগ কমেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। কিন্তু দারিদ্র্য কমানোর জন্য এ কর্মসংস্থান যথেষ্ট হবে না।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় উদ্বেগ। কারণ বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে দারিদ্র্য কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো মানুষের জন্য আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
জ্বালানি সংকটে কারখানা, কর্মসংস্থানে চাপ
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটও নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশে নেমে এসেছে। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে অনেক কারখানা সক্ষমতার নিচে উৎপাদন করেছে। কোথাও কর্মঘণ্টা কমেছে, কোথাও উৎপাদন বন্ধ থেকেছে, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করেছে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে শ্রমজীবী মানুষের ওপর। কারখানায় উৎপাদন কমলে ও ব্যবসা সংকুচিত হলে প্রথম ধাক্কা আসে কর্মসংস্থানে। আর কর্মসংস্থান হারালে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো দ্রুত দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ে।
সবচেয়ে দরিদ্ররাই আবার সহায়তার বাইরে
দারিদ্র্য বাড়ার সময়ে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিই দরিদ্র মানুষের শেষ ভরসা। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই।
সরকার সামাজিক সুরক্ষা, খাদ্য, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকিতে অর্থ ব্যয় করছে। কিন্তু সুবিধাভোগী নির্বাচন ও কর্মসূচির সমন্বয়ের দুর্বলতায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন থাকা পরিবারগুলোর একটি বড় অংশ সহায়তার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, খাদ্যভিত্তিক একাধিক ভর্তুকি কর্মসূচিকে আরও ভালোভাবে সমন্বয় করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে নগদ সহায়তা কর্মসূচির লক্ষ্যনির্ধারণ উন্নত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব।
এ জন্য ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। এর মাধ্যমে কারা দরিদ্র হয়েছেন, কারা নতুন করে ঝুঁকিতে পড়েছেন এবং কারা সহায়তার জন্য যোগ্যতা তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
ব্যাংক দুর্বল, ঋণ যাচ্ছে অন্যদিকে
দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে অর্থনীতির আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ থাকলেও তা উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগে যথেষ্ট যাচ্ছে না। নতুন শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান তৈরি না হলে দারিদ্র্য কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ব্যাংকিং খাতের গভীর সংকট, কম রাজস্ব আহরণ ও দুর্বল সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তার মতে, বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু সুদের হার কমালেই হবে না; জ্বালানি, অবকাঠামো, সুশাসন ও ব্যবসার পরিবেশও উন্নত করতে হবে।
রাজস্ব কম, সহায়তার প্রয়োজন বেশি
দারিদ্র্য বাড়ার সময়ে সরকারের সামাজিক ব্যয়ের প্রয়োজনও বাড়ে। কিন্তু একই সময়ে সরকারের রাজস্ব আয় অত্যন্ত কম। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রাজস্ব জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার।
রাজস্ব আহরণ কম হওয়ায় সরকার একদিকে সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে পারছে না, অন্যদিকে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগও সীমিত রাখতে হচ্ছে।
বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঘাটতি ছিল জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। সরকারের মোট অর্থায়নের বড় অংশ এখন ব্যাংক থেকে আসছে। এতে ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বস্তি আছে রেমিট্যান্সে, কিন্তু তাতেও সমাধান নয়
অর্থনীতির সব সূচক অবশ্য খারাপ নয়। প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এতে বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কমেছে এবং রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা হয়েছে।
কিন্তু রেমিট্যান্স বাড়লেই দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান বা আয় বাড়ে না। বরং অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান দুর্বল থাকলে বিদেশে কর্মরত মানুষের পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ে।
সামনে কী হতে পারে?
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে। একই সময়ে জাতীয় দারিদ্র্যের হার আগামী অর্থবছরে বেড়ে ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। পরের অর্থবছরে তা সামান্য কমে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ দ্রুত কর্মসংস্থান ও আয় না বাড়লে দারিদ্র্যের চাপ সহসাই কমছে না।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান বিভাগের পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেছেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্র মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং আরও বেশি ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরির জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
অর্থনীতির বর্তমান চিত্রে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু প্রবৃদ্ধি কত হলো, তা নয়; এই প্রবৃদ্ধি থেকে কারা আয় করছে এবং কারা পিছিয়ে পড়ছে। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি এলেও যদি নতুন কর্মসংস্থান না বাড়ে, প্রকৃত আয় না বাড়ে, বিনিয়োগ না বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মানুষের আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন।
দারিদ্র্য কমাতে তাই এখন শুধু ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কাজের সুযোগ, উৎপাদন বাড়ানো, বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার টাকা যেন সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ নতুন করে দরিদ্র হওয়া মানুষদের বড় অংশ হয়তো একসময় দরিদ্র ছিলেন না। তারা ছিলেন কর্মজীবী, নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ আয়ের পরিবার। আয় কমে যাওয়া, চাকরি হারানো এবং ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ধাক্কায় তারাই এখন দারিদ্র্যের সীমার দিকে ঠেলে যাচ্ছেন।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এর পেছনে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি নয়, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, মানুষের আয় না বাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যও বড় ভূমিকা রাখছে।’
তিনি বলেন, ‘নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ব্যয় হয়। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়লে তাদের প্রকৃত আয় কমে যায় এবং জীবনযাত্রার ওপর চাপ দ্রুত বাড়ে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অনেক পরিবার আয় ধরে রাখতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে নতুন করে মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ছে।’
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দারিদ্র্য কমাতে শুধু সামাজিক সহায়তা বা বিভিন্ন ধরনের ভাতা বিতরণ যথেষ্ট নয়। মানুষের জন্য নিয়মিত, স্থায়ী ও সম্মানজনক আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তরুণ ও নারীদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা শ্রমবাজারে আরও বেশি যুক্ত হতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো যাতে সহায়তা পায়, তা নিশ্চিত করতে উপকারভোগী নির্বাচন ও অর্থ বিতরণে স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি জোরদার করতে হবে।’
তার মতে, দারিদ্র্য কমাতে হলে একই সঙ্গে মানুষের আয় বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার দিকে নজর দিতে হবে। এই তিন ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দারিদ্র্য কমানোর অগ্রগতি টেকসই করা কঠিন হবে।