রাজধানীর বিভিন্ন বাজারসহ পাড়া-মহল্লার দোকানেও সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। ঈদের আগের দিন বাজারে ভোজ্যতেলের এমন সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন এক ভিডিও-বার্তায় ব্যবসায়ীদের মজুতে থাকা সব তেল ঈদের আগে বিক্রির জন্য সরবরাহ করার আহ্বান জানান। তার এই আহ্বানে কাজ হয়নি। ব্যবসায়ীরা মজুত করা সয়াবিন তেল বাজারে ছাড়েননি। সোমবারও রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে সয়াবিন তেলের তীব্র সংকটের তথ্য পাওয়া গেছে।
সরেজমিন কোথাও কোনও দোকানে আগের মতো সয়াবিন তেলের সারি সারি বোতল দেখা যায়নি। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলো সরবরাহ দিচ্ছে না। তাই তেল নেই। আবার কোনও কোনও ব্যবসায়ী জানান, কোম্পানিগুলো তেল সরবরাহ দিচ্ছে না। যা দিচ্ছে, তাতেও শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে পোলাও চাল, চা পাতা, সরিষার তেল কিনতে হবে, না হলে সয়াবিন তেল দেবেন না।
শাহাদাত হোসেন নামে একজন ক্রেতা তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘তৈলহীন খসখসে ঈদ-২২। বাজারে সয়াবিন তেল নাই। কয়েকটি মার্কেট ঘুরে দুই দোকানে পেলাম। তবে শর্ত প্রযোজ্য। ৫ লিটার তেলের সঙ্গে এক লিটার সরিষার তেল ও এক কেজি চা পাতা ক্রয় করতে হবে। মূল্য ১১৫০ টাকা মাত্র। সবাইকে ঈদুল ফিতর-২০২২-এর শুভেচ্ছা।’
দেশের ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধি এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের দাবি— সয়াবিন তেলের সরবরাহে কোনও ঘাটতি নেই। খুচরা বিক্রেতারা তেল মজুত করায় বাজারে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বর্তমানে পাঁচ লিটারের বোতলের মোড়কে দাম লেখা ৭৬০ টাকা। অথচ ৮৫০ টাকায় তা বিক্রি করছে কোম্পানিগুলো। আমরা যদি এ দামে বিক্রি করি, তখন তো মামলা হবে।’
খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলে দুই টাকা বাড়িয়ে ৩১৪ টাকা দরে বিক্রি করছে। এছাড়া তাদের কাছ থেকে তেল কিনলে চা পাতা, সরিষার তেল, ফিরনি মিক্স, হালিম মিক্স, বেঙ্গল চা পাতা, হলুদ, মরিচ, আটা-ময়দা, সুজি ও লবণ কেনা বাধ্যতামূলক করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সোমবার (২ মে) ব্যবসায়ীদের নেতা হেলাল উদ্দিন এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘আমার সুপ্রিয় খুচরা দোকানদার ভাইয়েরা, বাজারে ভোজ্যতেলের সংকট দেখা দিয়েছে। আপনাদের কাছে আমি অনুরোধ করছি, আমি বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করছি—আপনাদের যার কাছে যতটুকু ভোজ্যতেল আছে, তা আপনারা বিক্রি করেন। এটা আমাদের ইমানি দায়িত্ব। রোজার মাসে কোনও ভোক্তা যেন কষ্ট না পায়। এতে যদি কিছুটা লস হয়, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা আগামীতে পুষিয়ে দেবেন। এটাই আমার প্রত্যাশা।’
রাজধানীর মাতুয়াইল মুসলিম নগরের খুচরা বিক্রেতা বিপ্লব বলেন, ‘ঈদের আগে বাজারে সয়াবিন তেল নেই। সয়াবিন তেলের সঙ্গে কোম্পানিগুলো চা পাতা ধরিয়ে দেয়। তবু সয়াবিন তেল পাচ্ছি না।’
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, ‘আমরা যদি তেল আনতে না পারি, তাহলে কীভাবে বাজারে দেবো? বিশ্ববাজারে তেল নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তো মজুতও করতে পারছি না। গুদামে ১০ ড্রাম তেল পেলেও জরিমানা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। তেল যারা আমদানি করেন, উৎপাদন করেন, তারা যদি না দেন, আমরা কীভাবে পাবো।’
বাংলাদেশে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, ‘ঈদের পর সয়াবিন তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন আশায় খুচরা বিক্রেতারা তেল মজুত করে রাখছেন। তাদের দোকানে তেল নেই, অথচ গোডাউনে মজুত করে রাখা আছে। ঈদের আগে তেল সংকটের কোনও কারণ নেই। আমরা নিয়মিত তেল সরবরাহ করছি।’ তিনি বলেন, ‘সিটি গ্রুপের পণ্য বিক্রি করতে শর্ত লাগে না।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান জানান, বাজারে সয়াবিন তেলের কোনও ঘাটতি নাই। অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা সঠিকভাবে তেল সাপ্লাই দিচ্ছেন। খুচরা বিক্রেতাদের দোকানের সামনে সয়াবিন তেল নেই ঠিকই, তবে দোকানের পেছনে তেল মজুত করছেন তারা।