কোরবানির পশুর চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ী বা মসজিদ-মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাইকারি বাজার পোস্তায় না গিয়ে এবার সরাসরি যাচ্ছে সাভার ট্যানারিতে। এ বছর পোস্তায় কাঁচা চামড়ার সরবরাহ খুবই কম। কেনা চামড়ায় লবণ লাগিয়ে সংরক্ষণের আশায় বস্তা বস্তা লবণ কিনে রাখলেও পোস্তার ব্যবসায়ীরা এখন অনেকটাই অলস সময় পার করছেন। ট্যানারি মালিকরা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় চামড়া কিনে কারখানায় সংরক্ষণ করছেন। পোস্তা ও সাভারে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে রবিবার (১০ জুলাই) কোরবানির প্রথম দিন রাতেও রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে চামড়া নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে মাদ্রাসার ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের। একটু ভালো দামে বিক্রির আশায় রাত পর্যন্ত বসে থাকে তারা। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা না আসায় কম দামেই বিক্রি করেছে বলে জানিয়েছে তারা। চামড়া কিনে রাস্তার মোড়ে জড়ো করেছেন ক্রেতারা। সকাল হতেই সেসব চামড়া সরাসরি সাভার ট্যানারিতে গেছে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনার কারণে হোক, আর মন্দার কারণে হোক, রাজধানীতে এ বছর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য চোখে পড়েনি। অনেক মহল্লায় ঘুরে সারা দিনেও একজন মৌসুমি চামড়া ক্রেতার দেখা মেলেনি। কারণ জানতে চাইলে উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা শেখ হাসিবুর রহমান জানান, ব্যবসা মন্দার কারণে এ বছর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা হয়তো ঝুঁকি নেয়নি। আর এ বছর এমনিতেই চামড়ার চাহিদা কম। আগে থেকেই তা জানা গেছে বলে হয়তো তারা রাস্তায় নামেনি।
মহল্লায় বসবাসকারী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী না থাকায় বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে চামড়া সংগ্রহের জন্য। কোরবানিদাতারাও সেভাবেই মাদ্রাসায় নিজের কোরবানি করা গরু বা ছাগলের চামড়া দান করে দিয়েছেন। তাই মাঠ পর্যায়ে চামড়ার দাম জানা যায়নি। যদিও সরকার এবার ঢাকায় গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট সর্বনিম্ন ৪৭ টাকা আর সর্বোচ্চ ৫২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকায় এ বছর লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৭ থেকে ৫২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে সারা দেশে প্রতি বর্গফুট খাসির কাঁচা চামড়া ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির চামড়ার ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৪ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্যানারি মালিকরা এই দামেই কাঁচা চামড়া কেনার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে ঢাকায় খাসি বা বকরির চামড়া কেউ কেনেননি। অনেককে কোরবানি করা খাসি-বকরির চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে দিতেও দেখা গেছে। অনেক এলাকার রাস্তায় পড়ে থাকতেও দেখা গেছে বকরির চামড়া।
শাহজাহানপুরের ওবায়দুল্লাহ হাসান জানান, তিনি কোরবানি করা পশুর চামড়া দান করেছেন ঝিল মসজিদ নুরানি মাদ্রাসায়। এভাবেই এহসান করিমও নামে একজনও ঝিল মসজিদে দান করেছেন। ঝামেলা এড়াতে মাদারটেকের নুরুল ইসলাম, শেওড়াপাড়ার নজরুল ইসলাম ও মিরপুরের জাকির হোসেন হাবীবও তার গরুর চামড়া নিজ নিজ এলাকার মাদ্রাসা ও মসজিদে দান করেছেন।
এদিকে রাজধানীর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর এ ব্যবসায় নামিনি। কারণ, গত দুই বছর কোরবানির ঈদে চামড়া কিনে লোকসানের মুখে পড়েছি। মূল টাকাই ওঠেনি। তাই এবার ব্যবসা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘কোনোভাবেই কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হতে দেবো না। চামড়া আমাদের জাতীয় সম্পদ। এ জন্য এ বছর কাঁচা ও ওয়েট ব্লু চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত দিয়েছি। একই সঙ্গে কোরবানিদাতাকে অনুরোধ করেছি, নিজেদের ব্যবস্থাপনায় নিজের কোরবানি করা পশুর চামড়ায় লবণ মাখিয়ে বিক্রি বা দান করুন।’
শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন জানান, চামড়া বাংলাদেশের সম্পদ। সাভারের ট্যানারি পল্লির কারখানাগুলো নতুন চামড়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে কারখানাগুলোয় চামড়া পৌঁছার আগে রাজধানীর পোস্তায় কাঁচা চামড়া বেচাকেনা হবে আগামী এক থেকে দেড় মাস। যা হয়তো কাল বা পরশু থেকেই শুরু হবে। পোস্তার ব্যবসায়ীরাই কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রথম কাজটি শুরু করেন লবণ মাখানোর মধ্য দিয়ে।
এদিকে মৌসুমি ব্যবসায়ী তোফাজ্জেল হোসেন জানিয়েছেন, আগে আমরা মাঠ থেকে চামড়া কিনে নিয়ে তা পোস্তার ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতাম। এ বছর আর সেই সুযোগ পাইনি। লোকসানের ভয়ে মাঠে মৌসুমি ব্যবসায়ী নেই। যারা আছেন, তারা মৌসুমি ব্যবসায়ী নন। তারা বড় বড় ট্যানারির প্রতিনিধি। কম দামে কেনা যায়। মান ভালো থাকে। পোস্তার ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট মোকাবিলা করতে হয় না বলে তারা সরাসরি মাঠ থেকে চামড়া কিনছেন।
জানতে চাইলে ট্যানারি মালিকদের কেউই কথা বলতে না চাইলেও সোনার বাংলা ট্যানারির ম্যানেজার কবির হোসেন বলেন, ‘ঝামেলা এড়াতেই আমরা এবার মাঠ থেকে চামড়া সংগ্রহ করছি।’