বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কারোপ, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার অবনতি, জ্বালানি সংকট ও দুর্নীতির কারণে বেসরকারি খাতের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে অন্তত তিন বছর সময় বাড়ানো প্রয়োজন।
রবিবার (২৪ আগস্ট) ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন।
বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মন্থর, বিনিয়োগে আস্থা সংকট
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তাসকীন আহমেদ জানান, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ২.৩ শতাংশে। শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগও ধীরগতির। চলতি অর্থবছরে জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের অংশ নেমে এসেছে ২২.৪৮ শতাংশে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক পরিবেশের স্থায়িত্ব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা জরুরি। একইসঙ্গে অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য করপোরেট করহার প্রতিযোগিতামূলক করার তাগিদ দেন তিনি।
রফতানি-আমদানির বৈষম্য
ডিসিসিআই সভাপতি জানান, এ সময়ে রফতানি কমেছে ৩.০৯ শতাংশ, বিপরীতে আমদানি বেড়েছে ৪৬.৮ শতাংশ। চামড়া, ওষুধ ও কৃষিজাত পণ্যের রফতানি হ্রাস পেলেও হালকা প্রকৌশল খাতে ১২.৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে ২৩.৬ শতাংশ। তিনি বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নতুন বাজার অনুসন্ধান, সাপ্লাই চেইন সংযোগ বৃদ্ধি, ইএসজি কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণ ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা জরুরি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, কিছুটা হলেও অর্থনীতি স্থিতিশীলতার পথে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে চালের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি বলেন, উচ্চ সুদহার একমাত্র প্রতিবন্ধক নয়, বরং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ইতিবাচক হলেও প্রস্তুতিতে ঘাটতি রাখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি কমলেও ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। দুর্নীতি দমনে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। তিনি কর আহরণ বাড়ানো, ডিজিটালাইজেশন ত্বরান্বিত করা এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে তৈরি পোশাক খাতের মতো বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান।
বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, দুর্নীতি দমন ও করদাতা সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কৃষিকে শিল্পের সাথে সমন্বয় করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) মাহমুদ সালাহউদ্দিন নাসের বলেন, সুদহার বেশি হলেও কেবল এটিই বিনিয়োগে প্রতিবন্ধক নয়। জ্বালানি সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও দায়ী। অন্য পরিচালক নওশাদ মুস্তাফা বলেন, ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণ বিতরণ চালু হলে খরচ কমবে।
এডিবি’র অর্থনৈতিক কর্মকর্তা মো. রাবিউল ইসলাম রফতানি বাজারে এসএমই খাতের সংযোগ বৃদ্ধি, পণ্য পরিবহন খরচ কমানো ও নতুন খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানে সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।