হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ জেট ফুয়েলের পাইপ লাইন নির্মাণ প্রকল্প আবারও চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিগত সরকার ২২৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল। তবে ৩৩৯ কোটি টাকা খরচ করেও প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ফের প্রকল্পটির জন্য ৪২০ কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নিচ্ছে। এবার এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ২২৮ কোটি টাকা প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়াবে ৭৫৯ কোটিতে।
জ্বালানি বিভাগ সূ্ত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে পাইপ লাইন নির্মাণের বাকি কাজ শেষ করতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর নিজস্ব অর্থায়নে বাকি কাজ শেষ হবে। বলা হচ্ছে, এটি হবে প্রকল্পের ফেইজ-২।
দরপত্র ছাড়াই গত সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু এই কাজটি শেষ করতে পারেনি ওই প্রতিষ্ঠান। করোনা মহামারিসহ অন্যান্য কারণ দেখিয়ে সরকারি ওই প্রতিষ্ঠানটি কাজ শেষ করতে আরও ৫৫০ কোটি টাকা দাবি করে। কিন্তু বিপিসি ওই কাজে আর অর্থায়ন করতে সম্মত হয়নি।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এর আগে যাদের কাজ দেওয়া হয়েছিল, তারা ফেল করেছে। কাজটি শেষ করতে পারেনি। তারা কাজ শেষ করতে আরও ৫৫০ কোটি টাকা দাবি করেছিল। যাচাই-বাছাই ছাড়া আমরা অতিরিক্ত অর্থ দিতে পারি না। এজন্য নতুন করে আবারও প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে বিভাগে পাঠানো হয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জ্বালানি বিভাগ সম্প্রতি বিপিসির প্রকল্প-প্রস্তাবটির ওপর মতামত চেয়েছে। জানা গেছে, প্রথম দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। পরে একবছর ৫ মাস বাড়িয়ে ২০২০ সালের জুন এবং পরে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। তখন প্রকল্পটির জন্য ৩৩৯ কোটি টাকা খরচ করা হয়।
বিপিসি বলছে, ওই টাকায় জমি অধিগ্রহণ, ১৫ কিলোমিটার পাইপ লাইন স্থাপন এবং কয়েকটি সংরক্ষণ ট্যাংক বসানো হয়। কিন্তু এরপরও প্রকল্পের বিস্তর কাজ বাকি থেকে যায়। মাঝে করোনা মহামারির জন্য প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। বিপিসি জানায়, প্রথমে সরকারি ওই প্রতিষ্ঠান কাজটি পেলেও পরে দেশীয় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের হয়ে কাজটি করে।
কী আছে নতুন প্রস্তাবনায়
নতুন করে প্রকল্পের প্রস্তাব বা ডিপিপিতে বলা হয়েছে—বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে পদ্মা অয়েল পিএলসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই বছর ৬ মাসে কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২০ কোটি টাকা, যা বিপিসির নিজস্ব অর্থায়নে বহন করা হবে।
প্রস্তাবে বলা আরও হয়, বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে আমদানিকৃত জেট এ-১ প্রথমে গোদনাইল ডিপোতে পৌঁছায়। সেখান থেকে প্রায় ১৭০-১৮০টি ট্যাংকলরিতে করে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ৪০০ মেট্রিক টন জ্বালানি কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে পরিবহন করা হয়। এভাবে বছরে পরিবহন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভাড়া বাবদ ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি এবং পরিবহন লসের কারণে ক্ষতি হয় আরও ২০ কোটি টাকা। যানজট, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতায় ও শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে প্রায়ই জেট ফুয়েল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে।
এতে আরও বলা হয়, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে শাহজালালে জেট এ-১-এর চাহিদা দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই সড়কপথে ট্যাংকলরি-নির্ভর পরিবহন ব্যবস্থাকে অচল হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
প্রকল্পের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, পিতলগঞ্জ থেকে কুর্মিটোলা পর্যন্ত ১৫ দশমিক ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ ৮ ইঞ্চি ব্যাসের ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন নির্মিত হলে সরাসরি বছরে প্রায় ৮ দশমিক ৩৬ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে পরিবহন খরচ বাঁচবে, জ্বালানি লস বন্ধ হবে, যানজট ও পরিবেশ দূষণ কমবে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হবে।
এখন যেসব কাজ করবে বিপিসি
সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে, এখন ফেজ-২-এ যেসব কাজ করতে চাইছে বিপিসি, সেগুলো হলো— ডিটেইলড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন ও ড্রইং প্রণয়ন, জেটি নির্মাণ ও আনলোডিং যন্ত্রাংশ বসানো, পাম্পিং ফ্যাসিলিটিজসহ নতুন ডিপো নির্মাণ, তিনটি স্টোরেজ ট্যাংক ও অবশিষ্ট পাইপলাইন স্থাপন, টেস্টিং ও কমিশনিং, ক্যাথোডিক প্রোটেকশন, স্ক্যাডা সিস্টেম ও অপটিক্যাল ফাইবার সংযোজন, জেনারেটর, ট্রান্সফরমার, ভালভ, পিগিং সিস্টেম, ফায়ার ফাইটিং সরঞ্জাম স্থাপন এবং প্রকল্প তদারকির জন্য ব্যবস্থাপনা পরামর্শক নিয়োগ।