ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে বললেন একে আজাদ

শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারস অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসি বাংলাদেশ) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ বলেছেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না। নতুন সরকারের সামনে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি খেলাপিঋণ, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেন।

বুধবার (৪ মার্চ) রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘লুকিং ইনটু বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট: প্রাইয়োরেটি ফর দ্য নিউলি ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট ইন দ্য শর্ট টু মিডিয়াম টার্ম’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

খেলাপিঋণ বড় বাধা

এ কে আজাদ বলেন, ‘‘বর্তমানে দেশে গড় খেলাপি ঋণের হার ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে এবং সরকারি ব্যাংকগুলোতে তা প্রায় ৫০ শতাংশ ‘’

‘‘ এই বিপুল অর্থ কারা নিয়েছে? যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি (উইলফুল ডিফল্টার), তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি এক্সিট পলিসি দিয়েছে— আমরা সেটিকে সমর্থন করি। তবে যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে অন্য খাতে সরিয়ে নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ফিরবে না,” বলেন তিনি।

সরকারি ঋণ বাড়ছে, বেসরকারি খাত সংকুচিত

তিনি জানান, বর্তমানে সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণের হার ৩২.১৯ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬.১ শতাংশ। এতে শিল্পোদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না। “আমার জন্য টাকা নেই, থাকলেও নিতে পারছি না। গ্যাস সংযোগ নেই, বিদ্যুৎ সংকট— নতুন শিল্প বিনিয়োগ করবো কীভাবে?”—প্রশ্ন রাখেন তিনি।

এ কে আজাদের অভিযোগ, সরকারের মোট ঋণের ৫৮ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে বেতন-ভাতা, সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকিতে, যা নন-প্রোডাক্টিভ খাতে যাচ্ছে। রাজস্ব আহরণও আশানুরূপ নয়। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব এসেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩.৯৭ শতাংশে।

জ্বালানি সংকটে শিল্প বিপাকে

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘হাজার হাজার নতুন গ্যাস সংযোগের আবেদন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তিতাসে আটকে আছে। শিল্পকারখানায় গ্যাস না পেয়ে উদ্যোক্তাদের বাড়তি খরচে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।’’ “চুলার গ্যাস এলপিজিতে রূপান্তর করলে সেই গ্যাস শিল্পে দেওয়া সম্ভব,” বলেন তিনি।

তিনি দাবি করেন, প্রায় ১০ শতাংশ গ্যাস চোরাই লাইনে চলে যাচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ ছাড়া এ সংকট নিরসন সম্ভব নয়।

সরকারি ব্যয় পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব

সরকারি ব্যয় সংকোচনের আহ্বান জানিয়ে এ কে আজাদ বলেন, ‘‘মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সংখ্যা ও কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়নে একটি কমিশন গঠন করা উচিত।’’ অপ্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। “যেখানে সাধারণ মানুষের তেল-চাল কেনার সামর্থ্য কমে যাচ্ছে, সেখানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় গ্রহণযোগ্য নয়,” মন্তব্য করেন তিনি।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের আহ্বান

প্রতিবেশী দেশগুলোর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বিনিয়োগকারীদের ক্যাপিটাল মেশিনারির ওপর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তা, নারী কর্মী নিয়োগে ভর্তুকি, জমি ও ইউটিলিটিতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।’’ “অথচ আমি ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে পড়ে কীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকব?”—প্রশ্ন রাখেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘‘শুধুমাত্র ব্যাংকঋণের সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হলে শিল্প-কারখানা চালু রাখতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিল্প সচল থাকলেই ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক আদায় বাড়বে— ফলে অর্থনীতি গতি পাবে।’’