বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ করেছেন এমন এক সময়ে, যখন তার নিয়োগ প্রক্রিয়া, পেশাগত পরিচয় এবং নীতিগত অবস্থান ঘিরে শুরুতে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখনও পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি। তবে এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত দিকনির্দেশনা, মুদ্রানীতি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাত সংস্কারের নানা উদ্যোগ অর্থনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রসঙ্গত, মো. মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ পান। আগামী ৬ জুন তার মেয়াদ ১০০ দিন পূর্ণ হবে।
নীতিনির্ধারক, ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মতে, প্রথম ১০০ দিনকে চূড়ান্ত সাফল্য বা ব্যর্থতার মানদণ্ডে বিচার করা না গেলেও নীতিগত দিক থেকে একটি স্পষ্ট ‘স্ট্যাবিলিটি-ফার্স্ট’ অবস্থান দৃশ্যমান হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে গভর্নরের সাম্প্রতিক নীতিগত অগ্রাধিকারকে তিনটি প্রধান স্তম্ভে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা যায়—১. অর্থনৈতিক উদ্দীপনা ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার, ২. সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ৩. ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও কাঠামোগত সংস্কার।
অর্থনৈতিক উদ্দীপনা ও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার: স্থবিরতা ভাঙার চেষ্টা
প্রথম ১০০ দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবচেয়ে বড় ফোকাস ছিল দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগ খাতে গতি ফেরানো। বিশেষ করে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন ও প্রণোদনা তহবিলকে অর্থনীতিতে ‘লাইফলাইন ইনজেকশন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই উদ্যোগের পাশাপাশি বন্ধ ও অচল শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর কর্মসূচি, উৎপাদনমুখী খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং সিএমএসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতে অর্থায়ন সম্প্রসারণকে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে বন্ধ ও অর্ধচালু শিল্প পুনরুজ্জীবনে ২০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ‘বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ নামে এ উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদন, রফতানি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে চায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
স্কিমটির আওতায় তফসিলি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে তহবিল নিয়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে পারবে। তিন বছর মেয়াদি রিভলভিং ফান্ড থেকে বন্ধ, আংশিক চালু ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মূলধন সংকটে থাকা শিল্প-সেবা প্রতিষ্ঠান সুবিধা পাবে। তবে খেলাপি ও অনিয়মে জড়িত প্রতিষ্ঠান বাদ থাকবে। ঋণ শুধুমাত্র কার্যকর মূলধনে ব্যবহার করা যাবে—বেতন, কাঁচামাল, ইউটিলিটি ও উৎপাদন ব্যয়ে। সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উদ্যোগটি সফল হলে শিল্প পুনরুজ্জীবন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে। তবে সঠিক যাচাই-বাছাই ও তদারকি না হলে ঝুঁকি রয়ে যাবে। এটি দেশের স্থবির শিল্প খাতে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা অর্থনীতিবিদরা বলছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে ডলার সংকট, উচ্চ সুদের হার এবং জ্বালানি খরচ বৃদ্ধির কারণে যে শিল্পমন্দা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এ ধরনের পুনরুজ্জীবনমূলক পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তারা একইসঙ্গে সতর্ক করে বলছেন, এসব নীতির বাস্তব সফলতা নির্ভর করবে ব্যাংকিং খাতের কার্যকারিতা এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের গতির ওপর।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে তার মতে, অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য বা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘‘সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করা হয়নি, যা নীতিগত কার্যকারিতার ক্ষেত্রে একটি ঘাটতি হিসেবে রয়ে গেছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী ৮০ দিনের মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।’’
এ সময় তিনি ইতিবাচক দিক হিসেবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেছেন, এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি এবং সঠিক খাতে অর্থ ব্যবহারের ওপর। তার মতে, এসব শর্ত ঠিকভাবে পূরণ হলে প্রণোদনা প্যাকেজ দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘‘কম সুদে ঋণ দিলে ব্যবসায়ীদের তারল্য বাড়বে, তবে তারল্য বাড়লেই তা সঠিক বিনিয়োগে রূপ নেবে—এটা নিশ্চিত নয়।’’ তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘‘মাঝারি ব্যবসা খাতে খেলাপি ঋণের চাপ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।’’
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভে কঠোর নজর
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তুলনামূলক কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে এবং নীতিসুদের ক্ষেত্রে সংযত কিন্তু কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং ডলার বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপ বাজারে আস্থার কিছুটা পুনরুদ্ধার ঘটিয়েছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তবে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের মতে, দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় থাকলে বিনিয়োগ ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা নতুন শিল্প স্থাপন এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণে কিছুটা ধীরগতি আনতে পারে।
ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও সংস্কার: আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা
তৃতীয় এবং সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্র হলো ব্যাংকিং খাতের সংস্কার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নেতৃত্ব ব্যাংকিং সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিএমএসএমই পুনঃঅর্থায়ন সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থার অগ্রগতি, ঋণের দণ্ডসুদ হ্রাস এবং পুনঃতফসিল নীতিতে কিছুটা নমনীয়তা আনা।
এই পদক্ষেপগুলো একদিকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হলেও অপরদিকে কিছু নীতির ক্ষেত্রে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন নীতি নিয়ে সমালোচকরা বলছেন, এটি দীর্ঘমেয়াদে খেলাপি সংস্কৃতিকে আরও দৃঢ় করতে পারে এবং নৈতিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নীতির ভারসাম্য: উন্নয়ন বনাম ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ১০০ দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামগ্রিক অবস্থানকে একটি ‘স্ট্যাবিলিটি-ড্রিভেন গ্রোথ অ্যাপ্রোচ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়—অর্থাৎ প্রথমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, তারপর ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।
এই নীতির ফলে একদিকে যেমন অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার ইঙ্গিত মিলছে, অন্যদিকে এর পূর্ণাঙ্গ প্রভাব এখনও দৃশ্যমান হয়নি। বিশেষ করে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া।
প্রেক্ষাপট: চ্যালেঞ্জপূর্ণ অর্থনীতির মধ্যেই দায়িত্ব গ্রহণ
গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণ করেন এমন এক সময়ে, যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট, খেলাপি ঋণের চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দুর্বলতা, ডলার বাজারে অস্থিরতা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা—সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি এক জটিল পরিস্থিতিতে ছিল।
এই বাস্তবতায় তার গৃহীত নীতিগত পদক্ষেপগুলোকে সামষ্টিক অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনগণের জীবনযাত্রার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, এটি এখনও ‘প্রাথমিক পর্যায়ের নীতি পরীক্ষা’ মাত্র।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের প্রথম ১০০ দিনকে অর্থনীতির একটি ‘পজিশনিং পিরিয়ড’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই সময়ে তিনি মূলত একটি কাঠামোগত ভিত্তি তৈরির চেষ্টা করেছেন, যেখানে নিয়ন্ত্রণ, স্থিতিশীলতা এবং ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার—এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা দেখা যায়। অবশ্য অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নরকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ব্যাংকের সমালোচনা করছেন অনেকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, তার নীতিগুলোর চূড়ান্ত সফলতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—১. নীতির বাস্তবায়ন গতি, ২. ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতা ও শৃঙ্খলা এবং ৩. বেসরকারি খাতের আস্থা পুনরুদ্ধার।