খুলছে নতুন দিগন্ত, আসছে ইসলামী সঞ্চয়পত্র

বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের চাহিদা দীর্ঘদিন ধরেই বাড়ছে। দেশের ব্যাংক খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আমানত এখন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হলেও শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ এখনও সীমিত। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মধ্যম সঞ্চয়কারীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে শরিয়াহভিত্তিক কোনও সঞ্চয়পত্র না থাকায় অনেক ধর্মপ্রাণ নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি আর্থিক পণ্যের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

অবশেষে সেই দাবির প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে। সরকার প্রথমবারের মতো শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থ বিভাগের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির (সিডিএমসি) সাম্প্রতিক সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও কারিগরি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আগামী বছরের শুরুতেই এ সঞ্চয়পত্র বাজারে আসতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কেন শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র?

সরকার প্রতি বছর পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করে। স্থানীয় উৎস থেকে সরকারের ঋণের একটি বড় অংশ আসে ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড এবং সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তুলনামূলক কম ব্যয়ে অর্থ সংগ্রহের বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও ইসলামিক ট্রেজারি বিল চালু করা গেলে একদিকে যেমন সরকারের অর্থ সংগ্রহের নতুন সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে ধর্মীয় কারণে প্রচলিত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করা বিপুল জনগোষ্ঠীকেও বিনিয়োগের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

ইসলামিক ট্রেজারি বিলের পর এবার ইসলামী সঞ্চয়পত্র

শরিয়াহভিত্তিক সরকারি বিনিয়োগ পণ্য চালুর প্রক্রিয়া নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বরে অর্থ বিভাগ ২০ হাজার কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি ইসলামিক ট্রেজারি বিল চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এবার আসছে শরিয়াহসম্মত সঞ্চয়পত্র।

জানা গেছে, নতুন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নির্ধারণে একটি বিশেষ কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি শরিয়াহ নীতিমালা, বাজার পরিস্থিতি এবং বিদ্যমান আর্থিক পণ্যের রিটার্ন বিবেচনা করে মুনাফার হার নির্ধারণ করবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদন সাপেক্ষে বাজারে ছাড়া হবে নতুন সঞ্চয়পত্র।

সুকুকে নজিরবিহীন সাড়া

সরকারের এই উদ্যোগের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে সুকুকের বিপুল জনপ্রিয়তা। এ পর্যন্ত সরকার ছয়টি সুকুক বা ইসলামি বন্ড ইস্যু করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বরাদ্দের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি আবেদন জমা পড়েছে।

সর্বশেষ গত মাসে গ্রামীণ সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকার সাত বছর মেয়াদি সুকুক ইস্যু করা হয়। কিন্তু ওই সুকুকের বিপরীতে আবেদন আসে ৭২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার, যা ঘোষিত পরিমাণের প্রায় ১২ দশমিক ৩ গুণ বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব সফটওয়্যার ‘শরিয়াহ সিকিউরিটিজ মডেল (এসএসএম)’ ব্যবহার করে পরিচালিত ওই নিলামে অংশ নেয় ইসলামী ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো, বিভিন্ন প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ দিতে হয়। এই বিপুল সাড়া সরকারের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে দেশে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের একটি বিশাল সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে।

সীমিত পণ্যের কারণে আটকে আছে বিনিয়োগ

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত স্কিম ছাড়া শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে যারা সুদভিত্তিক আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগ করতে চান না, তাদের অনেকেই সঞ্চিত অর্থ ব্যাংক হিসাবেই রেখে দেন অথবা বিকল্প খুঁজে পান না।

অন্যদিকে সুকুক ইস্যুর ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একটি সুকুক ইস্যুর পর নতুন আরেকটি সুকুক বাজারে আনতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যায়। কারণ সুকুক ইস্যুর জন্য নির্দিষ্ট অন্তর্নিহিত সম্পদ প্রয়োজন হয়, যা সব সময় সহজলভ্য নয়। ফলে বিপুলসংখ্যক বিনিয়োগকারী শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যে বিনিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। নতুন সঞ্চয়পত্র চালু হলে এই শূন্যতা অনেকটাই পূরণ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ কমছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সঞ্চয়পত্র খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগের চেয়ে মেয়াদপূর্তিতে অর্থ পরিশোধের পরিমাণ বেশি হয়েছে। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সরকারের মোট সঞ্চয়পত্র ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রবণতার মধ্যেই শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র নতুন বিনিয়োগকারী আকর্ষণ করতে পারে এবং সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি আনতে পারে।

দীর্ঘদিনের দাবির বাস্তবায়ন

শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর দাবি নতুন নয়। ২০২৪ সালে এ ধরনের সঞ্চয়পত্র ও বন্ড চালুর দাবিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল।

নোটিশে বলা হয়েছিল, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য শরিয়াহসম্মত সরকারি বিনিয়োগ পণ্যের অভাব একটি বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী সুদভিত্তিক বিনিয়োগ পরিহার করতে চান এমন নাগরিকদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যদিও সরকারিভাবে ওই নোটিশের সঙ্গে বর্তমান উদ্যোগের সরাসরি সম্পর্কের কথা বলা হয়নি, তবে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও আর্থিক চাহিদার প্রতিফলন হিসেবে শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর সিদ্ধান্তকে দেখা হচ্ছে।

নতুন সুযোগ, নতুন বাজার

অর্থনীতিবিদদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালু হলে দেশের আর্থিক বাজারে নতুন একটি বিনিয়োগ খাত তৈরি হবে। এতে ধর্মীয় কারণে প্রচলিত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করা লাখো মানুষ সঞ্চয়ের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবেন। একইসঙ্গে সরকারও অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পাবে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সুকুকের মতো শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্রও বাজারে ব্যাপক সাড়া পেতে পারে। কারণ দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রসার, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের চাহিদা এবং নিরাপদ সরকারি বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহ—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের শুরুতেই দেশের আর্থিক বাজারে যুক্ত হবে নতুন একটি সরকারি বিনিয়োগ পণ্য—যা বাংলাদেশের ইসলামি অর্থব্যবস্থার বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।