বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদারত্ব, জবাবদিহি ও সুশাসনের ভিত্তিতে পরিচালনা করাই বর্তমান সংস্কার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য। একইসঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ হ্রাস, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
সোমবার (৮ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’-এর নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর, সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, দি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন, সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী এবং দৈনিক আগামীর সময় সম্পাদক মোস্তফা মামুন উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নররাও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে গভর্নর ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে।
দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণে অগ্রগতি
গভর্নর জানান, দুর্বল ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে কিছু প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (সিবিএস) উন্নয়ন ও সমন্বয় শেষ হলে পুনর্গঠন কার্যক্রম আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে।
খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি সংস্কার
খেলাপি ঋণের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য অর্থঋণ আদালত আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান গভর্নর। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের আদায়-অযোগ্য ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদেশে জব্দ সম্পদ দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
অর্থপাচার ও চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার সমমূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বলে বৈঠকে জানান গভর্নর। তিনি বলেন, ‘‘এসব সম্পদ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।’’
ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে পুনর্গঠন
গভর্নর বলেন, ‘‘ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি বৃহৎ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।’’
ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন উদ্যোগ
ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়ে গভর্নর জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমন্বিত ডিজিটাল আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কাজ করছে। এর আওতায় ডিজিটাল ন্যানো-লোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ঋণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, ক্রেডিট ব্যুরো অনুমোদন এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডেন্টিটি, ওয়ান ওয়ালেট” ধারণার বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করা হবে। একই সঙ্গে ‘বাংলা কিউআর’ চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যা ক্যাশলেস লেনদেন সম্প্রসারণ এবং গ্রাহক পর্যায়ের লেনদেনকে আরও সহজ করবে।
চিকিৎসা ও আমদানি ব্যয়ে সুবিধা
বিদেশে চিকিৎসার জন্য অনুমোদিত সীমার অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন সাপেক্ষে দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানান গভর্নর।
এ ছাড়া ইউপিএএস ব্যবস্থায় বিল ডিসকাউন্টিংয়ের জন্য ব্যবহৃত তহবিলের মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সুদহার কমানো হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকদের ব্যয় কমবে এবং পণ্যের দাম হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈঠকে সম্পাদক পরিষদের নেতারা ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক মতামত তুলে ধরেন। উভয় পক্ষ দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।