বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়নি: এনবিআর চেয়ারম্যান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। বরং ভূমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রকৃত লেনদেনমূল্য প্রকাশে করদাতাদের উৎসাহিত করতে একটি সীমিত সুযোগ রাখা হয়েছে, যা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

এর আগে সকালে বাজেট প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি প্রস্তাবিত বাজেটে ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ রাখা হয়েছে বলে সমালোচনা করে। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এ ধরনের সুযোগ সমর্থনযোগ্য নয়।

সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, “ভালো বাজেটের কালো দিক হলো কালো টাকা। এই সুযোগটি না রেখে বাজেটকে কালো টাকা-মুক্ত রাখা যেত কি না।”

জবাবে আব্দুর রহমান খান বলেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, দেশে জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত ক্রয়-বিক্রয়মূল্য এবং নিবন্ধনমূল্যের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ফলে প্রকৃত অর্থে বৈধ আয় থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্রেতা-বিক্রেতা কর-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েন।’’

তিনি বলেন, ‘‘গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জমি বিক্রেতাদের জন্য একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি পাঁচ কোটি টাকায় জমি বিক্রি করলেও নিবন্ধন সম্পন্ন হয় মাত্র এক কোটি টাকার মূল্যে। ফলে অবশিষ্ট চার কোটি টাকার উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েন। এ অবস্থায় যদি বিক্রেতা ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের প্রমাণ, বায়নানামাসহ প্রয়োজনীয় দলিল উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে নিয়মিত কর এবং ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর (গেইন ট্যাক্স) পরিশোধ করে সেই অর্থ বৈধভাবে প্রদর্শনের সুযোগ পান।’’

এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, এবারের বাজেটে একই ধরনের একটি সুবিধা ক্রেতাদের জন্যও বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ অনেক সময় কোনও ব্যক্তি ২০ কোটি টাকায় ফ্ল্যাট বা জমি কিনলেও নিবন্ধনে মূল্য দেখানো হয় অনেক কম। পরে কর কর্তৃপক্ষ প্রকৃত লেনদেনের তথ্য পেলে অতিরিক্ত কর ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হয় ক্রেতাকে।

তিনি বলেন, “ক্রেতাদের এই ধরনের জটিলতা থেকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার জন্যই নতুন বিধানটি যুক্ত করা হয়েছে। তারা যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রকৃত লেনদেনমূল্য ঘোষণা করেন, তাহলে নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করে তা বৈধভাবে দেখাতে পারবেন। আর যাদের অর্থের উৎস ও কর পরিশোধের তথ্য আগে থেকেই স্বচ্ছ, তাদের অতিরিক্ত কোনো কর দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।”

তবে এ বিধান নিয়ে আপত্তি থাকলে সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।

পরে একই প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন,‘‘ জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত মৌজা রেট বাস্তব বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় এ ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’’

অর্থমন্ত্রী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করতে হওয়ায় অনেক কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। তবে মৌজা রেট সংস্কারের বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

তিনি বলেন, “মৌজা রেট পুনর্নির্ধারণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা মৌজা রেটকে বাস্তব বাজারমূল্যের কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে কালো টাকা সাদা করার মতো বিতর্কিত সুযোগের প্রয়োজন অনেকাংশে কমে যাবে।”

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘সারা দেশের মৌজাভিত্তিক ভূমির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল কাজ। কারণ একই মৌজার মধ্যে বাণিজ্যিক, আবাসিক ও কৃষিজমির মূল্য ভিন্ন হতে পারে। এজন্য দেশব্যাপী বিস্তারিত জরিপ পরিচালনা করতে হবে।’’

তিনি বলেন, “যখন মৌজা রেটকে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব হবে, তখন প্রকৃত লেনদেনমূল্য গোপনের প্রবণতা কমবে এবং কালো টাকা সাদা করার সুযোগও অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাবে।”

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রচলিত অর্থে ‘কালো টাকা সাদা করার’ কোনও সাধারণ সুযোগ রাখা হয়নি; বরং ভূমি ও আবাসন খাতে প্রকৃত লেনদেনমূল্য প্রকাশ এবং কর ব্যবস্থাকে আরও বাস্তবসম্মত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।