বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারই ছিল প্রধান ভরসা। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন। যে দেশ একসময় শুধু বাংলাদেশের বৃহত্তম আমদানির উৎস ছিল, সেই দেশেই এখন রফতানির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) চীনে বাংলাদেশের রফতানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৬ শতাংশ বেশি। বর্তমান প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে জুন মাসের হিসাব যোগ হওয়ার পর প্রথমবারের মতো চীনে বাংলাদেশের রফতানি ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
এমন এক সময়ে ২৩ থেকে ২৬ জুন চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের পক্ষ থেকে এই সফরকে শুধু কূটনৈতিক নয়, বরং অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যবসায়ী নেতাদের আশা, এই সফরের মাধ্যমে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে চীনে বাংলাদেশের রফতানি ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ভিত্তি তৈরি হবে।
সুযোগের বাজার, কিন্তু রফতানি এখন সীমিত
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। প্রায় ১৪০ কোটির বেশি মানুষের এই বাজারে খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য, শিল্প কাঁচামাল, ভোক্তা সামগ্রী, চামড়াজাত পণ্য, প্রযুক্তি উপকরণ থেকে শুরু করে হাজারো পণ্যের চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশ ২০২০ সাল থেকে ধাপে ধাপে চীনের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। প্রথমে ৯৭ শতাংশ, পরে ৯৮ শতাংশ এবং সর্বশেষ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে বেইজিং।
কিন্তু এত বড় সুবিধা পাওয়ার পরও বাংলাদেশের রফতানি প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। কারণ বাংলাদেশের রফতানি ঝুড়ি এখনো অত্যন্ত সীমিত। তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যই মূলত চীনে রফতানি হয়।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে চীনে সবচেয়ে বেশি রফতানি হয়েছে তৈরি পোশাক। এরপর রয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, জুতা, হোম টেক্সটাইল ও প্লাস্টিক সামগ্রী।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীন নিজেই বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। ফলে শুধু পোশাকের ওপর নির্ভর করে এই বাজারে বড় সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। বরং নতুন পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে হবে।
কেন বাড়ছে না রফতানি?
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব।
চীন যে ধরনের পণ্য ব্যাপক পরিমাণে আমদানি করে, তার অধিকাংশই বাংলাদেশের রফতানি তালিকায় নেই। আবার কিছু পণ্য থাকলেও পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে— রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা; আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা; বড় পরিসরে উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা।
শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেই রফতানি বাড়ে না; সেই সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন বাজারভিত্তিক উৎপাদন কৌশল, দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য পরিকল্পনা।
বাণিজ্য ঘাটতির পাহাড়
রফতানি বাড়লেও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক এখনো ব্যাপকভাবে অসম।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশ চীন থেকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে রফতানি হয়েছে মাত্র ৬৭ কোটি ডলারের কিছু বেশি।
ফলে মাত্র ১০ মাসেই দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে, যা বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ।
বাংলাদেশ মূলত চীন থেকে কাপড়ের কাঁচামাল, সিনথেটিক সুতা, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক পণ্য, শিল্প উপকরণ ও মূলধনী যন্ত্র আমদানি করে। দেশের শিল্প উৎপাদনের বড় অংশই এসব আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
এ কারণে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না হলেও রফতানি বৃদ্ধি করে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
ইউয়ানের বিপরীতে টাকার দুর্বলতা নতুন চাপ
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে ইউয়ানের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন।
গত দেড় বছরে শুধু ডলারের বিপরীতে নয়, চীনা মুদ্রা ইউয়ানের বিপরীতেও টাকার মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর ফলে চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি এবং মধ্যবর্তী পণ্যের খরচ বেড়ে গেছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিক্স ও হালকা প্রকৌশল খাতের উদ্যোক্তারা এর প্রভাব সরাসরি অনুভব করছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অপরদিকে, চীনা ঋণে বাস্তবায়িত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধ ব্যয়ও টাকার হিসাবে বেড়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফর শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সফরে বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মনে করেন, শুধু রফতানি নয়, চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণই হতে পারে সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ।
তার মতে, চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে উৎপাদন করলে সেই পণ্য পুনরায় চীনে রফতানির সুযোগ তৈরি হবে। এতে রফতানি যেমন বাড়বে, তেমনি প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নও ত্বরান্বিত হবে।
নতুন পণ্যের সন্ধানে বাংলাদেশ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের বাজারে প্রবেশের জন্য এখন নতুন পণ্যের দিকে নজর দিতে হবে।
সম্ভাবনাময় পণ্যের তালিকায় রয়েছে— চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য; জুতা ও ফুটওয়্যার; পাট ও পাটজাত পণ্য; প্লাস্টিক সামগ্রী; সিরামিক পণ্য; কাঁকড়া ও সামুদ্রিক খাদ্য; শুকনো খাদ্যপণ্য; তিল ও কৃষিপণ্য; আম, কাঁঠালসহ মৌসুমি ফল; হালকা প্রকৌশল পণ্য; খনিজভিত্তিক ও চুম্বক শিল্পের উপকরণ।
একইসঙ্গে চীনের বিভিন্ন প্রদেশে বাংলাদেশি পণ্যের একক প্রদর্শনী আয়োজন, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ, সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
সামনে যে সুযোগ
চীন বর্তমানে অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শ্রমনির্ভর অনেক শিল্প ধীরে ধীরে বিদেশে স্থানান্তর করছে দেশটি। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ যদি শুল্কমুক্ত সুবিধা, সাশ্রয়ী শ্রমশক্তি, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে চীনা বিনিয়োগ ও রফতানি উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব।
তবে শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার বাস্তব উদ্যোগ।
চীনের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি ১ বিলিয়ন ডলারের দুয়ারে পৌঁছেছে। এখন প্রশ্ন হলো—এই অর্জন কি কেবল একটি প্রতীকী মাইলফলক হয়ে থাকবে, নাকি প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে আগামী কয়েক বছরে তা ৩ বিলিয়ন ডলারের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের আগামী অধ্যায়।
/এম/