দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকারের অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, অর্থনীতি এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তবে সরকারের নেওয়া সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগের ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি স্থিতিশীলতার পথে যাবে এবং পরবর্তী সময়ে প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির নতুন ধারা সৃষ্টি হবে।
রবিবার (২১ জুন) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। সম্মানিত অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমরা মনে করি, আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে দেশ সমৃদ্ধির পথে অগ্রসর হবে।”
জ্বালানি সংকট বড় বাধা
দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বহু বছর ধরে গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়ার কারণে বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে, তবে এর সুফল পেতে সময় লাগবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “তিন মাসে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অর্থ ব্যয় করলেই তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যাবে না। বিদেশ থেকে গ্যাস এনে সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে অন্তত ১৮ মাস সময় প্রয়োজন।”
২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট—এই তিনটি খাতের উন্নয়ন ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। সরকার এসব খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে আসছে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও বাস্তবায়ন জট কমাতে আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিশেষ ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালুর ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতি তিন মাস অন্তর মূল্যায়নের পরামর্শ দিলে জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, “ত্রৈমাসিক পর্যালোচনার পরিবর্তে আমরা একটি ড্যাশবোর্ড চালু করছি। এর মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্প দৈনিক ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করা হবে।”
হয়রানি বন্ধে টাস্কফোর্স
বাজেটে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন নিয়মকানুন সহজ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একটি টাস্কফোর্স গঠনের কথাও জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালু করা হবে, যেখানে কোনও নাগরিক বা ব্যবসায়ী সরকারি বিধি-বিধানের ভুল প্রয়োগ কিংবা প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগ জানাতে পারবেন। টাস্কফোর্স এসব অভিযোগ পর্যবেক্ষণ ও সমাধানের উদ্যোগ নেবে।”
রফতানিতে উন্মুক্ত সুবিধা
রফতানি খাতের বহুমুখীকরণে সরকার ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু তৈরি পোশাক শিল্প নয়, যেকোনও রফতানিমুখী শিল্প এখন বন্ড সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। এছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সম্পূর্ণ শুল্ক ও করমুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানির সুযোগও রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রফতানির জন্য কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলার বাধ্যবাধকতাও অনেক ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে, যাতে উদ্যোক্তারা দ্রুত ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
উন্নয়ন প্রকল্পে নতুন কর্মপরিকল্পনা
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণের কারণ চিহ্নিত করতে সরকার কাজ করছে। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।
বাজেটকে ‘অবাস্তব’ বললেন আখতার হোসেন
এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন প্রস্তাবিত বাজেটকে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ‘অবাস্তব’, ‘ঘাটতি নির্ভর’ ও ‘ঋণনির্ভর’ হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, বাজেট বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে নিয়মিতভাবে সংসদ ও জনগণকে অবহিত করতে হবে।
সরকারের সামনে তিন বড় সংকট
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে ঋণ বিনিয়োগের উপকরণ নয়, বরং টিকে থাকার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, অনেক পরিবার ব্যয় কমাতে খাদ্য গ্রহণ সীমিত করছে, চিকিৎসা বিলম্বিত করছে এবং অতিরিক্ত আয়ের জন্য একাধিক কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে মানসিক চাপ ও সামাজিক সমস্যাও বাড়ছে।
তার মতে, সরকারের সামনে বর্তমানে তিনটি প্রধান সংকট রয়েছে—কর্মসংস্থান সংকট, বিনিয়োগ সংকট এবং শিক্ষার গুণগত মানের সংকট।
বৈষম্য কমাতে সম্পদ করের প্রস্তাব
র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, দেশের মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক বর্তমানে মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এই বৈষম্য কমাতে সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার কর চালুর বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, বিদ্যমান সারচার্জ ব্যবস্থা সম্পদ বৈষম্য মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
শিল্প খাতের প্রধান সমস্যা জ্বালানি
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। উচ্চ সুদের হারও বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, “এ মুহূর্তে নতুন প্রবৃদ্ধির চেয়ে বিদ্যমান শিল্পকে টিকিয়ে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জ্বালানি সংকট নিরসনে কার্যকর ও দৃশ্যমান কর্মপরিকল্পনা এখনো দেখা যাচ্ছে না।”
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ী সমাজ এখনো পুরোপুরি নিরাপত্তা অনুভব করছে না।
শ্রমিকদের জন্য বিশেষ কিছু নেই
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, নতুন বাজেটে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হলেও তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
সংলাপে বক্তারা সামগ্রিকভাবে মত দেন, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু বাজেট ঘোষণা নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মতো কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।