রফতানি ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা কি সম্ভব 

বাংলাদেশের বর্তমান বার্ষিক রফতানি আয় প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। এমন বাস্তবতায় দেশের রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তাঁর মতে, সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাতকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নীতিগত সহায়তা, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারলে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন নয়।

তবে প্রশ্ন হলো, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের পক্ষে কি সত্যিই ১৫০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয় অর্জন সম্ভব? সম্ভব হলেও কতদিনে এবং কোন কোন খাতের ওপর ভর করে এ লক্ষ্য অর্জন করা যাবে?

অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং রফতানিকারকদের মতে, লক্ষ্যটি অসম্ভব নয়, তবে এটি অর্জন করতে হলে শুধু আশাবাদ নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, বাজার বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।

গার্মেন্টস খাতের উদ্যোক্তারাও মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাস্তবভিত্তিক কৌশল প্রণয়ন এবং তার সফল বাস্তবায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত। সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাতকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় এনে নীতিগত সহায়তা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।”

তিনি বলেন, “তবে এ লক্ষ্য কতদিনে অর্জিত হবে, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনার গুণগত মান এবং বাস্তবায়নের গতির ওপর। শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না, সেটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।”

মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, এখনই এমন একটি জাতীয় রফতানি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের রফতানি আয় ধাপে ধাপে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। তার ভাষায়, “বাংলাদেশের সামনে এখনও বড় সুযোগ রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে পারলে রফতানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।”

যখন রফতানি আয় কমছে

বাণিজ্যমন্ত্রীর এ আশাবাদী বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের রফতানি খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) দেশের রফতানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে রফতানি আয় হয়েছে ৪৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল প্রায় ৪৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তার কারণে রফতানি প্রবৃদ্ধি চাপের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বর্তমান রফতানি আয়কে প্রায় তিনগুণ বাড়িয়ে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য অনেকের কাছেই উচ্চাভিলাষী বলে মনে হচ্ছে।

পোশাক খাত কি একাই ১০০ বিলিয়ন ডলার দিতে পারবে?

বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বর্তমানে এ খাতের বার্ষিক রফতানি আয় প্রায় ৩৬ থেকে ৩৮ বিলিয়ন ডলার। তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সম্প্রতি বলেছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যবসাবান্ধব নীতি এবং অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে শুধু পোশাক খাত থেকেই ১০০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় সম্ভব।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, মাত্র চার-পাঁচ বছরের মধ্যে বর্তমান রফতানি আয় প্রায় তিনগুণে উন্নীত করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ বৈশ্বিক পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও তুরস্কের মতো দেশগুলোও একই বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।

তারপরও বাংলাদেশ যদি উচ্চমূল্যের পোশাক, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, স্পোর্টসওয়্যার, সিনথেটিক ফাইবারভিত্তিক পণ্য এবং ডিজাইনভিত্তিক পণ্যের দিকে অগ্রসর হতে পারে, তাহলে পোশাক খাত থেকে ৭০-৮০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় অর্জনের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন শিল্প বিশ্লেষকরা।

কোন খাতগুলো হতে পারে নতুন চালিকাশক্তি?

বাণিজ্যমন্ত্রী সরাসরি কোনও খাতভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ না করলেও তিনি চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও পাট খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য

বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজারের আকার কয়েকশ বিলিয়ন ডলার। অথচ বাংলাদেশ এখনও এ খাতের সম্ভাবনার খুব সামান্য অংশ কাজে লাগাতে পেরেছে। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর পরিবেশগত সমস্যার সমাধান, আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন এবং উচ্চমূল্যের চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে এ খাত থেকে ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং

বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রকৌশল শিল্প রয়েছে। বর্তমানে এ খাতের রফতানি সীমিত হলেও কৃষিযন্ত্রাংশ, অটোমোবাইল পার্টস, ইলেকট্রিক্যাল কম্পোনেন্ট এবং শিল্পযন্ত্র উৎপাদনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতি সহায়তা পেলে আগামী এক দশকে এ খাত ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি আয় করতে পারে।

পাট ও পাটজাত পণ্য

প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাটভিত্তিক ফেব্রিক, জিও-টেক্সটাইল, কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল এবং ফ্যাশন পণ্য উৎপাদন বাড়ানো গেলে পাট খাত নতুন করে সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। বর্তমানে যেখানে পাট খাতের রফতানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম, সেখানে মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাজার তৈরি করা সম্ভব।

কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য

হালাল খাদ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, ফল, সবজি, মাছ ও মাংসভিত্তিক পণ্যের বিশ্ববাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে আধুনিকায়ন করা গেলে এ খাতও ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রফতানি আয়ের উৎস হতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাত

বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল সেবার বাজার দ্রুত বাড়ছে। সফটওয়্যার, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও), ফ্রিল্যান্সিং এবং আইটি-সক্ষম সেবা খাতকে নীতিগত সহায়তা দিলে আগামী এক দশকে এ খাতও বড় রফতানি উৎসে পরিণত হতে পারে।

এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে। এর ফলে ইউরোপসহ বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধার একটি অংশ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকের মতে, অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলেও তা কাজে লাগাতে না পারলে এলডিসি উত্তরণের পর রফতানি খাত নতুন চাপের মুখে পড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এখন থেকেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যবসা সহজীকরণের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় বাধা কোথায়?

ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে রফতানি প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় বাধা হলো— গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, উচ্চ সুদহার, ডলারের অস্থিরতা, বন্দরে দীর্ঘসূত্রতা, কাস্টমস জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতির ধারাবাহিকতার অভাব। এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া উচ্চাভিলাষী রফতানি লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।

কতদিনে সম্ভব ১৫০ বিলিয়ন ডলার?

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান ৫০-৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হলে রফতানি আয়কে প্রায় তিনগুণ বাড়াতে হবে। যদি বার্ষিক গড়ে ১০-১২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা যায়, তাহলে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে ১২ থেকে ১৫ বছর সময় লাগতে পারে। তবে ১৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গেলে সময় কিছুটা কমতে পারে। অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো কঠিন হলেও ২০৩৫ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

উচ্চাভিলাষী, তবে অবাস্তব নয়

বাংলাদেশের রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। তবে এটি অবাস্তব নয়। শুধু তৈরি পোশাক নয়, চামড়া, পাট, হালকা প্রকৌশল, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।

কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো বাস্তবভিত্তিক রোডম্যাপ। কোন খাত থেকে কত আয় আসবে, কত বছরে আসবে, কী ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে এবং কোন সংস্কারগুলো জরুরি— এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া ১৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য কেবল রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশাবাদ হিসেবেই থেকে যেতে পারে।

আর যদি পরিকল্পনা, নীতি সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় আনা যায়, তাহলে আগামী দেড় দশকের মধ্যে বাংলাদেশের রফতানি অর্থনীতি সত্যিই নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।