জাতীয় সংসদে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট সাময়িকভাবে বাতিলের প্রস্তাব সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে—ঘরে জমিয়ে রাখা অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা, মানি লন্ডারিং কমানো এবং কালো টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা। তবে অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সম্ভাব্য সুফলের চেয়ে ঝুঁকি ও ক্ষতির পরিমাণই বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত উচ্চমূল্যের মুদ্রা। এগুলো একযোগে বাতিল করা হলে— তা শুধু কালো টাকার মালিকদের নয়, বরং পুরো অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নগদ লেনদেননির্ভর খাতগুলো।
প্রথম ধাক্কা আসবে নগদ অর্থের সংকটে
অর্থনীতিবিদদের মতে, নোট বাতিলের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব হিসেবে বাজারে নগদ অর্থের সংকট দেখা দেবে। বাংলাদেশে এখনও বিপুল পরিমাণ লেনদেন নগদ টাকায় সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, কাঁচাবাজার, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে উচ্চমূল্যের নোট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
যদি হঠাৎ করে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট অচল হয়ে যায়, তাহলে মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটা করতে সমস্যায় পড়বে। পর্যাপ্ত ছোট নোটের সরবরাহ না থাকলে বাজারে লেনদেন কমে যাবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়তে পারে।
ব্যাংকিং খাতে তৈরি হবে তীব্র চাপ
বাতিল হওয়া নোট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে হলে দেশের সব ব্যাংকে গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি তৈরি হতে পারে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। একইসঙ্গে নগদ অর্থ সংগ্রহ, যাচাই, গণনা এবং নতুন নোট বিতরণে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বড় ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনানুষ্ঠানিক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনও নগদ লেনদেননির্ভর। ক্ষুদ্র দোকান, কাঁচাবাজার, পরিবহন, কৃষিপণ্য বিপণন এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমবাজারে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার সীমিত।
নোট বাতিল হলে এসব খাতে লেনদেন কমে যেতে পারে। অনেক ব্যবসায়ী সাময়িকভাবে বিক্রি বন্ধ রাখতে বাধ্য হতে পারেন। এতে উৎপাদন, সরবরাহ ও ভোগ— সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগ আরও দুর্বল হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক অ্যাট কোর্টল্যান্ডের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বর্তমানে দেশের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে অনেক নিচে নেমে এসেছে। এ অবস্থায় বড় মূল্যমানের নোট বাতিল করা হলে অর্থনীতিতে নগদ অর্থের সংকট আরও তীব্র হবে।’’
তার ভাষায়,‘‘বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই উচিত হবে না। এতে অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ আরও কমে যাবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নতুন করে ধাক্কা খাবে’’
মূল্যস্ফীতি কমবে এমন নিশ্চয়তা নেই
কিছু মহলে ধারণা রয়েছে, বড় নোট বাতিল করলে বাজারে অর্থের প্রবাহ কমবে এবং মূল্যস্ফীতিও কমে আসবে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ এই যুক্তির সঙ্গে একমত নন।
ড. বিরূপাক্ষ পালের মতে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ অতিরিক্ত নগদ অর্থ নয়; বরং সরবরাহ সংকট, চাঁদাবাজি, বাজারের সিন্ডিকেট, পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যা। ফলে নোট বাতিল করলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে— এমনটি ভাবার সুযোগ নেই।
আতঙ্ক, গুজব ও আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বড় নোট বাতিলের ঘোষণার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেকেই মনে করতে পারেন, তাদের হাতে থাকা নগদ অর্থ মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে মানুষ একসঙ্গে ব্যাংকে ছুটবে, বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে এবং গুজবও ছড়িয়ে পড়তে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ডলার ও স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে
যখন মানুষ নগদ অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে, তখন বিকল্প সম্পদের দিকে ঝোঁক বাড়ে। অর্থনীতিবিদদের ধারণা, বড় নোট বাতিল হলে অনেকেই ডলার, স্বর্ণ কিংবা অন্যান্য নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগের চেষ্টা করতে পারেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের অভিজ্ঞতা কী বলছে
২০১৬ সালে ভারত সরকার হঠাৎ করে ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করেছিল। সে সময় দেশটির মোট প্রচলিত নগদ অর্থের প্রায় ৮৬ শতাংশ একদিনে অচল হয়ে যায়। সরকারের লক্ষ্য ছিল কালো টাকা, জালনোট ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধ করা। কিন্তু পরে ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রায় ৯৯ শতাংশ নোটই আবার ব্যাংকে ফিরে আসে। ফলে কালোটাকা উদ্ধারের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, অনানুষ্ঠানিক খাত এবং দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসুও সেই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ‘ভালো অর্থনীতি’ নয়। কালো টাকা দমনে ব্যাপক ধাক্কা দেওয়ার পরিবর্তে লক্ষ্যভিত্তিক ও ‘সার্জিক্যাল’ ব্যবস্থা নেওয়াই বেশি কার্যকর।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঝুঁকি আরও বেশি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর এক গবেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কালোটাকার মালিকদের ধরতে গিয়ে পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা উচিত হবে না। বাস্তবে অপরাধীরা নানা উপায়ে নিজেদের অর্থ বৈধ করার পথ খুঁজে নেয়, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ এবং ছোট ব্যবসায়ীরা।
তার মতে, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি এমনিতেই ধীরগতিতে চলছে। এই সময়ে বড় মূল্যমানের নোট বাতিল করা হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত নয়, সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত প্রস্তাব
উল্লেখ্য, ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের বিষয়ে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন ব্যক্তিগতভাবে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তাঁর যুক্তি, এতে ঘরে জমিয়ে রাখা অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে।
তবে অর্থনীতিবিদদের অধিকাংশই মনে করছেন, শুধু বড় নোট বাতিল করলেই কালোটাকা, দুর্নীতি বা মূল্যস্ফীতির মতো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে না। বরং বর্তমান বাস্তবতায় এমন পদক্ষেপ অর্থনীতিতে নগদ সংকট, ব্যবসায়িক স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত চাপ এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। তাদের মতে, কালোটাকা দমন ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক কর সংস্কার, শক্তিশালী আর্থিক নজরদারি এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ—হঠাৎ নোট বাতিল নয়।