নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা

বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিয়ে যা বললেন গভর্নর

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই ২০২৬ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি (মনিটারি পলিসি স্টেটমেন্ট) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের উচ্চ সুদহার, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম হলরুমে এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নররা, বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং আর্থিক খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুদ্রানীতির মূল প্রবন্ধ বা 'কি-নোট' উপস্থাপন করেন ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান।

নতুন মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি এখনও অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই আগামী ছয় মাসেও সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল থাকবে। ফলে নীতিসুদ অপরিবর্তিত রেখে ১০ শতাংশে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমেছে, কিন্তু লড়াই এখনও শেষ নয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছিল। ধারাবাহিক কঠোর মুদ্রানীতির ফলে তা ২০২৬ সালের মে মাসে কমে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। যদিও এই অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তবে তাদের মতে মূল্যস্ফীতি এখনও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, জ্বালানি ব্যয় এবং আমদানি খরচ বৃদ্ধির মতো কাঠামোগত কারণে সৃষ্টি হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বড় প্রণোদনা

কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বীকার করেছে, দীর্ঘদিনের উচ্চ সুদহার এবং অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদন প্রত্যাশিত গতিতে বাড়ছে না। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করছে। এই পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে বের করে আনতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে।

এই তহবিল থেকে শিল্প, কৃষি এবং ক্ষুদ্র, কুটির, মাঝারি ও অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঋণ পাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই অর্থের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং শিল্প উৎপাদনে নতুন গতি আসবে।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে বড় ধাক্কা

মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সরকারি ঋণগ্রহণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে ২০২৬ সালের মে মাস শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন।

ফলে ব্যাংকের উদ্বৃত্ত অর্থ উৎপাদনমুখী খাতে না গিয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ হচ্ছে।

ডলারের বাজারে হস্তক্ষেপ কমাবে বাংলাদেশ ব্যাংক

নতুন মুদ্রানীতিতে আবারও স্পষ্ট করা হয়েছে, বিনিময় হার হবে বাজারনির্ভর। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করবে এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে

বৈশ্বিক ঝুঁকির সতর্কবার্তা

মুদ্রানীতিতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকেও বড় ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আশঙ্কা, এসব কারণে জ্বালানি তেল, সার ও অন্যান্য কাঁচামালের আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে গেলে দেশে আবারও ব্যয়ভিত্তিক মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

ব্যাংক সংস্কারে নতুন রোডম্যাপ

নতুন মুদ্রানীতিতে ব্যাংক খাত সংস্কারকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬ বাস্তবায়ন করা হবে। ডিপোজিট প্রোটেকশন আইন-২০২৬ কার্যকর করা হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইএফআরএস-নাইন ভিত্তিক এক্সপেকটেড ক্রেডিট লস (ইসিএল) পদ্ধতি চালু করা হবে। রিসক বেসড সুপারভিশন আরও শক্তিশালী করা হবে। খেলাপি ঋণ বিক্রির জন্য ডিসট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট (ডিএএমএ) চূড়ান্ত করা হচ্ছে। অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করে ঋণ আদায় আরও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব পদক্ষেপ ব্যাংক খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ডিজিটাল লেনদেনে 'বাংলা কিউআর'

নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে এগোতে আন্তঃব্যাংক ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মধ্যে সহজ লেনদেন নিশ্চিত করতে "বাংলা কিউআর" নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএসের গ্রাহকরা একই কিউআর কোড ব্যবহার করে সহজে লেনদেন করতে পারবেন।

সরকারের লক্ষ্য অর্জনে সমন্বিত উদ্যোগ

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন মুদ্রানীতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি সীমিত আর্থিক প্রণোদনা, কর কাঠামোর সংস্কার এবং ব্যাংক খাতের সংস্কার একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে।

তবে সামনে এখনও উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক খাতের চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা আগামী মাসগুলোতে নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

সামগ্রিকভাবে, নতুন মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে, অন্যদিকে শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বড় প্রণোদনার মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফেরানোর চেষ্টা করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দুই লক্ষ্য— মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার— একসঙ্গে বাস্তবায়নই আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে।