ব্যাংক খাতের লুটপাটের তদন্ত চলছে: সংসদে অর্থমন্ত্রী

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকসহ ব্যাংকিং খাতে গত কয়েক বছরে সংঘটিত অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের তদন্ত চলছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পুরো আর্থিক খাতে এখন একটি ‘ক্লিনিং প্রসেস’ বা পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে।

রবিবার (১২ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের ২৩তম কার্যদিবসে গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাউদ্দিনের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সালাউদ্দিন অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের আমলে তদবির, ঘুষ-বাণিজ্য ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণের নামে লুটপাট হয়েছে। ফলে ব্যাংকটির প্রায় ৬১ শতাংশ ঋণ এখন খেলাপি। একই সঙ্গে পুরোনো সিন্ডিকেট এখনও ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের চেষ্টা করছে বলেও দাবি করে তিনি সুষ্ঠু তদন্ত ও সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি জানান।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি ব্যাংক নয়, একাধিক ব্যাংকে কী ঘটেছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অনেকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর্থিক খাতের সব অনিয়ম একদিনে দূর করা সম্ভব নয়, তবে এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর এলাকায় কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার (হিমাগার) এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের বিষয়ে জানতে চান।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাচ্ছেন, যেখানে গ্রামীণ এলাকা অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, কৃষি ও পল্লী খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি খাতে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি আমদানি-নির্ভর ফসল চাষে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব সুবিধা সারা দেশের জন্য প্রযোজ্য। তাই কোনও নির্দিষ্ট উপজেলার জন্য আলাদা ঋণ কর্মসূচি চালুর প্রয়োজন নেই।

এরপর সম্পূরক প্রশ্নে রুমিন ফারহানা রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংকের বিপুল খেলাপি ঋণের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে এসব ব্যাংকের দেওয়া ঋণের বড় অংশই খেলাপি হয়েছে। বিশেষ করে এস আলম, বেক্সিমকো, অ্যালন টেক্স গ্রুপ ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে পালিয়েছেন, তাদের বিষয়ে সরকার কোনও আপস করবে না। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং সম্পত্তি ক্রোকের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।

‘রাকাবে আগে আওয়ামী লীগ, এখন বিএনপির নামে লুটপাটের চেষ্টা’

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ঘিরে আগে আওয়ামী লীগের নামে লুটপাট হয়েছে, আর এখন একই সিন্ডিকেট বিএনপির নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জাতীয় সংসদে অভিযোগ তুলেছেন কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ।

নিজ নির্বাচনি এলাকার দরিদ্র কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তির প্রসঙ্গ তুলে আতিকুর রহমান মুজাহিদ বলেন, রাকাবকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আগে একটি গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের নামে লুটপাট করেছে, এখন তারা খোলস বদলে বিএনপির নাম ভাঙিয়ে একই ধরনের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। ব্যাংকটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও প্রকৃত অর্থে কৃষকবান্ধব করতে তদন্তের কোনও উদ্যোগ আছে কিনা জানতে চান তিনি।

জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপির মাধ্যমে ব্যাংক দখল বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কোনও সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, ‘কোনও ব্যাংকেই এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ বা রাজনৈতিক অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হচ্ছে না। ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম নিয়ে গভীর পর্যালোচনা চলছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।’

এদিকে, একই অধিবেশনে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন করেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান।

জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ফরিদগঞ্জে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার প্রসারে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উপজেলা সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সরকারের আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও জানান তিনি।