পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বেশ কয়েকটি বিধিনিষেধ শিথিল করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে মার্জিন ঋণ বিধিমালার সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। একইসঙ্গে বাজারে স্ক্রিপ নেটিং চালুরও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে একই দিনে কোনও নির্দিষ্ট শেয়ার একাধিকবার কেনাবেচার সুযোগ তৈরি হবে।
মঙ্গলবার (১৫ অনুষ্ঠিত কমিশনের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিগগিরই সংশোধিত বিধিমালার খসড়া জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করা হবে। এর আগে ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর মার্জিন ঋণ বিধিমালায় সর্বশেষ সংশোধনী গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছিল।
শিথিল হচ্ছে একাধিক বিধিনিষেধ
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, বর্তমানে অন্তত এক বছর ধরে ন্যূনতম পাঁচ লাখ টাকার বিনিয়োগ রয়েছে এবং পাঁচ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া ‘বি’ ক্যাটেগরির শেয়ারের ক্ষেত্রে মার্জিন ঋণ গ্রহণে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
এ ছাড়া মার্জিন অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থের মাধ্যমে নন-মার্জিনযোগ্য শেয়ার কেনার সুযোগ রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিধিমালার বিভিন্ন প্রয়োগগত জটিলতা দূর করতে আরও কয়েকটি পরিবর্তনের প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্ক্রিপ নেটিংয়ের অনুমোদন
কমিশনের সভায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) স্ক্রিপ নেটিং চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন বিনিয়োগকারী একই দিনে একটি শেয়ার কিনে পরে তা এক বা একাধিকবার বিক্রি কিংবা পুনরায় লেনদেন করতে পারবেন। তবে এ সুবিধা চালুর ক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যমান আইনি বিধান কঠোরভাবে অনুসরণের শর্ত দেওয়া হয়েছে।
ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার জানিয়েছেন, কমিশনের অনুমোদন মিললেও এটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার উন্নয়নে অন্তত চার মাস সময় লাগবে। প্রাথমিকভাবে ব্লুচিপভুক্ত প্রায় ৩০টি শেয়ারে এ সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজারে প্রভাব নিয়ে মতভেদ
বাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, গত বছরের সংশোধনের উদ্দেশ্য ছিল মার্জিন ঋণ নিরুৎসাহিত করা। নতুন প্রস্তাব সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন আইপিওর সরবরাহ কম থাকায় একই শেয়ারের ওপর অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হবে, যা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একটি শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত তিন থেকে ছয় মাসে অনেক শেয়ারের দাম দুই থেকে আট গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্জিন ঋণ সহজ করা এবং স্ক্রিপ নেটিং চালু করা বাজারে অতিরিক্ত জল্পনা-কল্পনা ও কারসাজির সুযোগ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের কমিশন আয়ও বাড়বে।
বিএসইসির ব্যাখ্যা
তবে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেছেন, বিধিমালার সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হলো বাস্তব প্রয়োগে থাকা কিছু জটিলতা দূর করা। এটি বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরির জন্য নয়।
অন্যদিকে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুর রহমান মজুমদারের মতে, স্ক্রিপ নেটিংয়ের ফলে দিনের শুরুতে কিছুটা চাহিদা তৈরি হলেও একই দিনে শেয়ার বিক্রির সুযোগ থাকায় বাজারে সরবরাহও বাড়বে। এতে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমে বাজার ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে।
আরও যেসব পরিবর্তন
সংশোধিত খসড়ায় বাজারের মূল্য-আয় (পিই) অনুপাত সংক্রান্ত বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। মার্জিনযোগ্য সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে পিই রেশিও ৩০ বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যমান বিধিমালায় গৃহিণী ও শিক্ষার্থীদের মার্জিন ঋণ গ্রহণে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, সেটিও প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো কার্যকর হলে পুঁজিবাজারে লেনদেনের গতি বাড়তে পারে। তবে এর সুফল ও ঝুঁকি—দুই দিকই বিবেচনায় রেখে বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।