বাংলাদেশের জন্য নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনা আগামী কয়েক মাস ধরে চলবে। সম্ভাব্য ঋণের পরিমাণ, কর্মসূচির পরিধি এবং এর বিপরীতে সরকারের বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার অঙ্গীকার—এসব বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধারাবাহিক আলোচনা হবে।
পাঁচ দিনের ঢাকা সফর শেষে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) আইএমএফের প্রতিনিধি দল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়। সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি এখনও রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান না হলে মধ্যম মেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যেতে পারে। তবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে অর্থনীতির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।
সরকারের অনুরোধে নতুন আইএমএফ-সমর্থিত অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে সংস্থাটির ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ১২ জুলাই ঢাকায় আসে। সফরের শেষ দিনে প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সমাপনী বৈঠক করে। এ সময় দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থিক খাতের অবস্থা এবং সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আইএমএফের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচির পাঁচটি কিস্তি ছাড়ের পর উভয় পক্ষের সম্মতিতে সেই কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এখন নতুন সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঢাকায় সফররত আইএমএফ মিশনের নেতৃত্ব দেন সংস্থাটির কর্মকর্তা ইভো ক্রজনার। সফর শেষে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার এবং সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহভিত্তিক এ সফরের মাধ্যমে সরকারের সংস্কার কর্মপরিকল্পনা এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। এখন নতুন সম্ভাব্য কর্মসূচির আকার, পরিধি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার অঙ্গীকার নিয়ে আগামী কয়েক মাস আলোচনা চলবে।
প্রবৃদ্ধি কমে সাড়ে ৩ শতাংশে নামার আশঙ্কা
আইএমএফের মূল্যায়নে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। রাজস্ব আহরণ দুর্বল থাকলে এবং ব্যাংকিং খাতের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যম মেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাড়িয়েছে চাপ
আইএমএফ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বেড়েছে। এর ফলে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও চাপে রয়েছে। যদিও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ এখনও শক্তিশালী রয়েছে।
রাজস্ব ও ব্যাংকিং সংস্কারে গুরুত্ব
সংস্থাটির মতে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও উন্নয়ন ব্যয় টেকসইভাবে বাড়াতে হলে রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি ভর্তুকি ব্যবস্থায় যৌক্তিক সংস্কার প্রয়োজন। তবে এসব সংস্কারের প্রভাব যাতে নিম্ন আয়ের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আইএমএফ আরও বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের জন্য কঠোর মুদ্রানীতি ও বিচক্ষণ রাজস্বনীতি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
বিনিময় হার ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের তাগিদ
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ সালে চালু হওয়া ‘ক্রলিং পেগ’ ভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে বিনিময় হার আরও নমনীয় হবে এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠনকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশলের আওতায় এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, ব্যাংকিং খাতে সুশৃঙ্খল সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে।