বৃষ্টি-বন্যার ধাক্কায় রাজধানীর বাজারে অস্থিরতা, ভোগান্তিতে ক্রেতারা

দেশজুড়ে টানা বৃষ্টি ও বিভিন্ন অঞ্চলের আকস্মিক বন্যার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারে। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে মাছ, সবজি ও ডিমের দাম। বেশিরভাগ সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে। একই সঙ্গে চাষের মাছ, ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের ডিমের দামও ঊর্ধ্বমুখী। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে রাজধানীর নারিন্দা, রায়সাহেব বাজারসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

টানা বৃষ্টি ও বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পুকুর, ঘের ও মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পাইকারি বাজারে মাছের সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাবে কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

বর্তমানে মাঝারি আকারের চাষের রুই ও কাতলা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা কয়েক দিন আগেও ছিল ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা। তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০ থেকে ২৫০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং চাষের চিংড়ি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে। বাজারে ইলিশের সরবরাহও কম। এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে গুনতে হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা।

নারিন্দা বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বলেন, ‘‘দেশের বিভিন্ন এলাকার ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে মাছের সরবরাহ কমে গেছে। পাইকারি বাজারেই বেশি দামে মাছ কিনতে হচ্ছে। তাই খুচরা বাজারে আগের দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমতে পারে।’’

বৃষ্টি ও বন্যার কারণে বিভিন্ন এলাকায় সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় রাজধানীতে সবজির সরবরাহও কমেছে। এর ফলে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

বর্তমানে বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১২০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, ঝিঙা ৮০ থেকে ৯০ টাকা, চিচিঙ্গা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, শসা ১২০ থেকে ১৬০ টাকা এবং লাউ ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। কাঁচা মরিচের দাম বেড়ে সাধারণ মানের ক্ষেত্রে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ভালো মানের মরিচ ২০০ টাকা কেজিতে পৌঁছেছে।

তবে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে পেঁপে, পটল ও ঢ্যাঁড়স। পেঁপে ২০ থেকে ৪০ টাকা, পটল ও ঢ্যাঁড়স ৪০ থেকে ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। আমদানি বেড়ে যাওয়ায় টমেটোর দামও কিছুটা কমে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায় নেমেছে।

রায়সাহেব বাজারের এক সবজি বিক্রেতা বলেন, ‘‘বৃষ্টির কারণে অনেক এলাকার সবজিখেত পানিতে তলিয়ে গেছে, আবার কোথাও পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে। ফলে বাজারে সরবরাহ অনেক কমে গেছে। আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ সবজি আসতো, এখন তার প্রায় অর্ধেক আসছে। পাইকারি বাজারেই দাম বেশি থাকায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আগামী কয়েক দিন দাম কমার সম্ভাবনা কম।’’

সবজির পাশাপাশি বেড়েছে ডিমের দামও। এক সপ্তাহ আগেও বাদামি ডিমের ডজন বিক্রি হতো ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়, এখন তা ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাদা ডিমের ডজন ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং হাঁসের ডিম ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা।

ডিম ব্যবসায়ীরা জানান, সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা বিকল্প হিসেবে ডিম কিনছেন। চাহিদা বেড়েছে, অন্যদিকে সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় দামও বেড়েছে।

হাঁসের ডিমের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা জানান, টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ কমে গেছে। অনেক এলাকা থেকে রাজধানীতে ডিম পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে।

এদিকে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে, যা আগে ছিল ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। সোনালি মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকায়।

তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, বৃষ্টি ও বন্যার বাস্তব প্রভাব থাকলেও কিছু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন।

রায়সাহেব বাজারের ক্রেতা নাসিরুদ্দিন বলেন, ‘‘প্রতিদিনই বাজারে এসে নতুন করে দামের ধাক্কা খেতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের আয় তো বাড়ছে না, কিন্তু প্রতিদিনই বাজার খরচ বাড়ছে। এখন প্রয়োজনীয় সব পণ্য একসঙ্গে কিনতে গেলেই বাজেটের বাইরে চলে যাচ্ছে।’’

পুরান ঢাকার বাসিন্দা তুষার রহমান বলেন, ‘‘টানা বৃষ্টিতে সরবরাহ কমে গেলে দাম কিছুটা বাড়তেই পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির তুলনায় যেভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে, তা স্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে কাঁচা মরিচ ২০০ টাকা কেজি হওয়ায় সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। মনে হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি কিছু অসাধু ব্যবসায়ীও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ নিচ্ছেন।’’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘‘সবজি ও মাছের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন লাগতে পারে। তাই অন্তত এই সময় পর্যন্ত বাজারে উচ্চমূল্যের চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।’’