দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে রফতানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাস্টমস বন্ড অডিট সহজীকরণ, বিমানবন্দরের কার্গো সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং লজিস্টিকস উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের নীতিগত সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পের সার্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সমন্বিত শুল্ক, কর ও আর্থিক নীতিমালা প্রণয়নেরও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (২২ জুলাই) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধিদল এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং উপদেষ্টা মাহদি আমিন।
বৈঠকে দেশের অর্থনীতির প্রধান রফতানি খাত হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, রফতানি বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান
বিজিএমইএ নেতারা জানান, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প উপায়ে উৎপাদন চালিয়ে যেতে গিয়ে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাস্টমস, ব্যাংকিং, গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর দাবি জানায় বিজিএমইএ।
বন্ড অডিট, কার্গো শেড ও লজিস্টিকস উন্নয়নের প্রস্তাব
বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘন ঘন বন্ড অডিটের জটিলতা কমাতে স্বনামধন্য পেশাদার অডিট ফার্মের মাধ্যমে বছরে একবার কাস্টমস অডিট সম্পন্ন করার স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
এছাড়া হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতার ঘাটতির কারণে লিড টাইম বাড়ছে উল্লেখ করে জরুরি ভিত্তিতে একটি অস্থায়ী কার্গো শেড নির্মাণের দাবি জানানো হয়।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সহজ করতে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি সহজ করা, মিথ্যা ঘোষণার (মিসডিক্লারেশন) প্রবণতা রোধ এবং বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর যৌথ সেবা ডেস্ক স্থাপনের অনুমতিও চাওয়া হয়।
শ্রমিক হাসপাতাল ও ভবন নির্মাণ বিধিমালা সহজ করার আহ্বান
গাজীপুরে বিপুলসংখ্যক পোশাকশ্রমিকের জন্য একটি আধুনিক বিশেষায়িত শ্রমিক হাসপাতাল নির্মাণে উপযুক্ত খাস জমি বরাদ্দের আবেদন জানায় বিজিএমইএ।
একই সঙ্গে কারখানার সম্প্রসারণ সহজ করতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও সহজ করারও প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সার্কুলার অর্থনীতি ও ‘বাটেক্সপো ২০২৬’
বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবেশগত নীতির আলোকে পোশাক খাতে শতভাগ বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা সার্কুলারিটি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। বিজিএমইএ জানায়, টেক্সটাইল বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তারা বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়াবে।
এই সময় আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক পোশাক প্রদর্শনী ‘বাটেক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি এতে সম্মতি জানান।
উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রফতানি আয়ে তৈরি পোশাক শিল্পের অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি বিজিএমইএর উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন এবং সচল কারখানার স্থায়িত্ব, বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু, নীতিগত সহায়তা সহজীকরণ ও শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকারের ধারাবাহিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে জানান।
এছাড়া বিজিএমইএর উত্থাপিত বিষয়গুলো পর্যালোচনা ও দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান, সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খান, সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, সহসভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান, সহসভাপতি ভিদিয়া অমৃত খান, সহসভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীসহ সংগঠনের পরিচালকরাও উপস্থিত ছিলেন।