উৎসে কর তদারকির ক্ষমতা স্থগিতের দাবি শীর্ষ ৮ চেম্বারের

উৎসে কর (উইথহোল্ডিং ট্যাক্স) তদারকি জোরদারের অংশ হিসেবে কর কর্মকর্তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ, হিসাবপত্র ও ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা, এমনকি প্রয়োজন হলে নথিপত্র জব্দ করার ক্ষমতা দিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারি করা নির্দেশনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। তারা এই নির্দেশনা অবিলম্বে স্থগিত বা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

এ লক্ষ্যে বুধবার (২২ জুলাই) এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে যৌথভাবে চিঠি দিয়েছে দেশের শীর্ষ আটটি চেম্বার ও ব্যবসায়ী সংগঠন। তাদের দাবি, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭ ধারা কার্যকরের বিষয়ে ব্যবসায়ী সমাজকে আগে থেকে অবহিত না করেই এ ধরনের নির্দেশনা জারি করায় উৎপাদন ও সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অযাচিত ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

চিঠিতে স্বাক্ষর করেন ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ এবং বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সভাপতি মইনুল ইসলাম।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য

চিঠিতে বলা হয়, গত ১৯ জুলাই এনবিআর আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭ ধারার আলোকে কর কর্মকর্তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আর্থিক নথিপত্র সরেজমিনে পরিদর্শনের বিষয়ে যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে, তা ব্যবসায়ী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে বিজ্ঞপ্তির শেষ অংশ থেকেই স্পষ্ট হয় যে, আইনের এ ধারার বাস্তব প্রয়োগ এখনো শুরু হয়নি এবং দেশের ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এ বিষয়ে পর্যাপ্তভাবে অবগত নন।

তাদের ভাষ্য, এনবিআরের এ উদ্যোগের পর উৎপাদন ও সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আকস্মিকভাবে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ী সমাজ সবসময় কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতাকে সমর্থন করে। তবে কর আদায়ে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থাভিত্তিক ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, বর্তমান সরকারের ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য সরকার ও ব্যবসায়ী সমাজকে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ব্যবসায়ী নেতারা আরও উল্লেখ করেন, কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ অনুযায়ী করপোরেট তথ্যের গোপনীয়তা, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৬ অনুযায়ী বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং সংবিধানের ৩১ ও ৪২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত নাগরিকের আইনগত অধিকার বিবেচনায় নিয়ে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭ ধারা প্রয়োগের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই ব্যবসায়ী সমাজে সৃষ্ট উদ্বেগ দূর করতে এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি অবিলম্বে স্থগিত বা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।

এনবিআরের নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে

গত রোববার উৎসে কর আদায় ও তদারকি কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এনবিআর। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭ ধারার আওতায় কর কর্মকর্তাদের যেসব ক্ষমতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—

যেকোনও বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ, ব্যবসাকেন্দ্র বা দপ্তরে বিনা বাধায় প্রবেশ করে সরেজমিনে পরিদর্শন।

হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক হিসাব বিবরণী, রসিদসহ অর্থনৈতিক কার্যক্রমসংক্রান্ত যেকোনও নথিপত্র পরীক্ষা ও তলব।

প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সংরক্ষিত তথ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভেঙে তথ্যে প্রবেশ।

উৎসে কর কর্তনের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় হিসাবপত্র, নথি বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড সাময়িকভাবে জব্দ করে হেফাজতে রাখা।

প্রয়োজনীয় নথিপত্র, ইমেজ বা অ্যাকাউন্টের অনুলিপি সংগ্রহ এবং তাতে শনাক্তকরণ চিহ্ন বা সিলমোহর ব্যবহার।

এনবিআর আরও জানিয়েছে, রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি বা অসহযোগিতা করলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৪৭(২) ধারা অনুযায়ী জরিমানার বিধান রয়েছে।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আপত্তির পর বিষয়টি নিয়ে সরকার ও এনবিআরের পরবর্তী অবস্থানের দিকে এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের।