বাংলাদেশে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ হচ্ছে এলপিপি?

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অন্যতম বড় আন্তর্জাতিক অর্থপরিশোধ বিরোধ এখন নতুন মোড় নিয়েছে। প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বকেয়া পণ্যমূল্য পরিশোধ না করেই বাংলাদেশ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ (অর্ডার) স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে পোল্যান্ডভিত্তিক ফ্যাশন রিটেইল জায়ান্ট এলপিপি। আর এই ঘোষণার পরই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করেছে দেশের পোশাক শিল্প।

খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পাওনা অর্থ পরিশোধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এলপিপিকে বাংলাদেশে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ (ব্ল্যাকলিস্ট) করার পাশাপাশি বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আন্তর্জাতিক ক্রেতা ফোরাম, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড প্ল্যাটফর্ম এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সামনে আনবে দেশের পোশাক খাতের সংগঠনগুলো।

শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, এটি শুধু অর্থ আদায়ের লড়াই নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দায়বদ্ধতা, চুক্তির প্রতি সম্মান এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ন্যায্য ব্যবসায়িক আচরণ প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। তাই বিষয়টিকে তারা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন।

অর্ডার স্থগিতের ঘোষণা

গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এলপিপি জানায়, তাদের বৈশ্বিক সোর্সিং কৌশল পুনর্মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়া এবং নতুন পণ্য উন্নয়নসংক্রান্ত কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হচ্ছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, একই সময়ে তারা অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের সক্ষমতা মূল্যায়ন করবে এবং ভবিষ্যতের সোর্সিং পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করবে।

তবে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের দাবি, এই সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যবসায়িক পুনর্মূল্যায়নের চেয়ে বেশি কাজ করছে চলমান অর্থপরিশোধ বিরোধ। তাদের মতে, পাওনা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর সরবরাহকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই নতুন অর্ডার বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এলপিপি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘দেনা-পাওনা বা অর্থ পরিশোধ নিয়ে বিরোধ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন কোনও বিষয় নয়। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের ইস্যু তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেগুলোর সমাধান হওয়া উচিত পারস্পরিক আলোচনা ও আস্থার ভিত্তিতে, ব্যবসা বন্ধ করে নয়।’’

তিনি বলেন, ‘‘এলপিপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা। তারা প্রতি বছর কয়েকশ কোটি ডলারের পোশাক সংগ্রহ করে এবং বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে তাদের বড় ধরনের উপস্থিতি রয়েছে। তাই তাদের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একটি বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে এ দেশের শিল্প, শ্রমিক এবং অর্থনীতির প্রতিও তাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।’’

রুবেল আরও বলেন, ‘‘পাওনা নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, মতপার্থক্য থাকতে পারে, আইনি প্রক্রিয়াও চলতে পারে। কিন্তু সে কারণে হঠাৎ করে নতুন ক্রয়াদেশ স্থগিত করে ব্যবসা কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত কোনও দায়িত্বশীল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে একটি ইউরোপীয় ব্র্যান্ড হিসেবে তাদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল ও অংশীদারত্বমূলক আচরণ আশা করা স্বাভাবিক।’’

বর্তমান বিশ্বে ব্যবসার সফলতা শুধু মুনাফার ওপর নির্ভর করে না; বরং অংশীদারদের প্রতি দায়বদ্ধতা, টেকসই সম্পর্ক এবং যৌথ দায়িত্ববোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আজকের বৈশ্বিক বাণিজ্যে ‘‘শেয়ারড রেসপনসিবিলিটি’’ এবং ‘‘ইনক্লুসিভ পার্টনারশিপ’’-এর ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার পরিবর্তে ব্যবসা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে আমি সমর্থন করতে পারি না।

‘‘আমার বিশ্বাস, আলোচনা চলবে, ব্যবসাও চলবে এবং একইসঙ্গে সমস্যারও সমাধান হবে। এটাই উভয় পক্ষের জন্য সবচেয়ে লাভজনক পথ। কারণ, আজ যদি বাংলাদেশে এমন নজির তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য কোনও উৎপাদনকারী দেশেও একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার কোনো বিকল্প নেই।’’

কীভাবে তৈরি হলো ৪০ মিলিয়ন ডলারের বিরোধ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার বাজারে সরাসরি ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতায় পড়ে এলপিপি। তখন প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার খুচরা বিক্রেতা এফইএস রিটেইল-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ এবং অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে।

রফতানিকারকদের দাবি, এলপিপির নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই তারা রুশ বাজারের জন্য পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানি করেছিলেন। শুরুতে অর্থ পরিশোধ স্বাভাবিক থাকলেও প্রায় ১৮ মাস আগে থেকে বিল দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তীকালে এলপিপি জানায়, এফইএস রিটেইলের সঙ্গে তাদের কোনও ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। এই অবস্থান নেওয়ার পরই বাংলাদেশের রফতানিকারকদের প্রায় ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পাওনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বর্তমানে এই বিরোধে প্রায় ৪০টি পোশাক কারখানা ও বায়িং হাউস জড়িত রয়েছে।

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আদালতের শরণাপন্ন রফতানিকারকরা

ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, গত দেড় বছর ধরে তারা নিয়মিত চিঠি, ই-মেইল ও বৈঠকের মাধ্যমে পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেছেন। প্রতিবারই সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনও অর্থ পরিশোধ হয়নি। শেষ পর্যন্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

রফতানিকারকদের অভিযোগ, এরপর এলপিপি আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করলেও প্রথম শর্ত হিসেবে মামলা প্রত্যাহারের কথা জানায়। কিন্তু কোনো অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা না থাকায় তারা সেই প্রস্তাবে রাজি হননি।

এবার ব্ল্যাকলিস্টের পথে এলপিপি

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘‘বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করবে কিনা, সেটি এলপিপির নিজস্ব ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাংলাদেশি রফতানিকারকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ না করলে তাদের বাংলাদেশে কালো তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’’

তিনি জানান, বিষয়টি শুধু দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বিভিন্ন ফোরাম, দায়িত্বশীল সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম, বৈশ্বিক ব্র্যান্ড নেটওয়ার্ক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছেও পুরো বিষয়টি তুলে ধরা হবে।

তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দায়িত্বশীল ব্যবসার কথা বলা কোনও ব্র্যান্ড যদি সরবরাহকারীদের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখে, তাহলে সেটি শুধু একটি আর্থিক বিরোধ নয়, বরং ব্যবসায়িক নৈতিকতারও লঙ্ঘন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ব্ল্যাকলিস্টের উদ্যোগ

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক পোশাক শিল্পে কোনও ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে সরবরাহকারীদের পাওনা আটকে রাখার অভিযোগ তুলে তাকে ব্ল্যাকলিস্ট করার উদ্যোগ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডও বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হবে। একইসঙ্গে এটি একটি বার্তা দেবে যে, বাংলাদেশ শুধু কম দামে পণ্য উৎপাদনকারী দেশ নয়— বরং ব্যবসায়িক ন্যায্যতা ও চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নেও এখন আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে প্রস্তুত।

উদ্যোক্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো কমপ্লায়েন্স, শ্রম অধিকার, পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের ওপর নানা শর্ত আরোপ করেছে। এখন সময় এসেছে ক্রেতাদেরও চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ ও ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার।

৭০ কোটি ডলারের ব্যবসা ঝুঁকিতে

বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এলপিপি বাংলাদেশ থেকে বছরে ৭০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের পোশাক সংগ্রহ করে।

সংগঠনটির সভাপতি আবদুল হামিদ বলেন, ‘‘এত বড় একজন ক্রেতাকে হারানো বাংলাদেশের জন্যও সুখকর নয়। তবে ব্যবসায়িক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে দুই পক্ষেরই চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।’’

তিনি জানান, এক পর্যায়ে এলপিপি বকেয়া অর্থের মাত্র ৫০ শতাংশ পরিশোধের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু এত বড় ছাড় মেনে নিলে অধিকাংশ রফতানিকারকই টিকে থাকতে পারবেন না।

ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারখানা

বকেয়া অর্থের কারণে অনেক কারখানার কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হেজাজ সোয়েটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর হোসেন জানান, তাদের প্রায় ৪৯ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক এক বছর ধরে গুদামে পড়ে আছে। কাঁচামাল কেনা, উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমিকদের মজুরি পরিশোধ করলেও পণ্যের মূল্য না পাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

আরেক প্রতিষ্ঠান শ্রাবণী নিটওয়্যার প্রায় ৭০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি করেছে এবং আরও প্রায় ৩০ হাজার ডলারের পণ্য গুদামে আটকে আছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনও অর্থ পায়নি।

বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা

অর্থনীতিবিদ ও শিল্প-সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিরোধের নিষ্পত্তি শুধু ৪০ মিলিয়ন ডলার আদায়ের বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।

তাদের মতে, যদি কোনও বৈশ্বিক ব্র্যান্ড চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ না করেও নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে অন্যদের মধ্যেও একই ধরনের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আবার বাংলাদেশ যদি ন্যায্য পাওনার প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের রফতানিকারকদের দরকষাকষির সক্ষমতা এবং গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, তারা কোনও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে বিরোধ চান না। তবে ন্যায্য পাওনা আদায় এবং ব্যবসায়িক আস্থা রক্ষার প্রশ্নে আপসের সুযোগও নেই। তাদের আশা, দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হবে। অন্যথায়, এলপিপির বিরুদ্ধে ব্ল্যাকলিস্টিংসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার পথেই এগোবে বাংলাদেশের পোশাক খাত।