দক্ষিণ কোরিয়ার বিশাল বাজারে বাংলাদেশের জন্য খুললো নতুন দুয়ার

বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘদিনের আলোচনার পর ৪ আগস্ট বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) সই হয়েছে। এই চুক্তিকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর যেসব বাজারে শুল্ক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এই চুক্তি, সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় ধরনের সুরক্ষা দেবে। একইসঙ্গে এটি বাংলাদেশের রফতানি বহুমুখীকরণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগও তৈরি করবে।

চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক (প্রেফারেনশিয়াল) প্রবেশাধিকার পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে দক্ষিণ কোরিয়ার ৮৭ শতাংশ পণ্য একই ধরনের সুবিধা ভোগ করবে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

রফতানিতে পতনের সময়েই এলো গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি

এই চুক্তির গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে একটি কারণে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রফতানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে।

অর্থাৎ, সিইপিএ এমন সময়ে কার্যকর হলো, যখন দুই দেশের বাণিজ্যে স্থবিরতার লক্ষণ দেখা দিচ্ছিল। ফলে এটিকে শুধু নতুন সুযোগ নয়, বরং হারাতে বসা বাজার পুনরুদ্ধারের কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের বর্তমান রফতানি চিত্র

বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের মোট রফতানির পরিমাণ প্রায় ৪২১ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর প্রায় ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতের।

রফতানির প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে— বোনা পোশাক (এইচএস-৬২): প্রায় ১৯৯ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলার (৪৭.৪৯ শতাংশ)। নিট পোশাক (এইচএস-৬১): প্রায় ১৬৭ দশমিক ১৩ মিলিয়ন ডলার (৩৯.৬৯ শতাংশ)। তামাক ও তামাকজাত পণ্য: ১২ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলার। জুতা ও জুতার যন্ত্রাংশ: ১২ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলার। উদ্ভিজ তন্তু ও কাগজের সুতা: ৫ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার। চামড়াজাত পণ্য, ব্যাগ ও স্যাডলারি: ৪ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলার। অন্যান্য তৈরি টেক্সটাইল পণ্য: ৩ দশমিক ১২ মিলিয়ন ডলার। অন্যান্য পণ্য: ১৫ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ডলার।

এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয়, দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রফতানি এখনও মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর। তবে চামড়া, জুতা, কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল ও অন্যান্য মূল্য সংযোজিত পণ্যের বড় সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগানো হয়নি।

বিশাল বাজার, কিন্তু অংশীদারত্ব খুবই সীমিত

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া বছরে প্রায় ১২ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পোশাক আমদানি করে। বৈশ্বিক পোশাক আমদানির প্রায় ৩ শতাংশ এই দেশটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অথচ এত বড় বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব এখনও খুবই সীমিত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েকটি কাঠামোগত কারণে বাংলাদেশ এতদিন প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

প্রথমত, দক্ষিণ কোরিয়ার ভোক্তারা তুলনামূলকভাবে উচ্চমূল্যের, ফ্যাশননির্ভর ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পোশাকের প্রতি বেশি আগ্রহী। অন্যদিকে বাংলাদেশের রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে মূলত বেসিক বা সাধারণ ধরনের পোশাকের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

দ্বিতীয়ত, চীন, ভিয়েতনামসহ আঞ্চলিক প্রতিযোগীরা কোরিয়ার বাজারে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলেছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য বাজার সম্প্রসারণ সহজ ছিল না।

তৃতীয়ত, দুই দেশের মধ্যে এতদিন কোনও পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি না থাকায় শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রতিযোগিতামূলক অসুবিধার মুখে পড়তে হতো বাংলাদেশি রফতা্নিকারকদের।

কী বদলে দেবে সিইপিএ?

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন সিইপিএ এসব সীমাবদ্ধতা অনেকটাই দূর করবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, জুতা, হালকা প্রকৌশল পণ্যসহ বিভিন্ন রফতানি খাতে শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়াবে। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার আমদানিকারকদের কাছে বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় উৎসে পরিণত হবে।

এছাড়া কোরিয়ার বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে নতুন ক্রয়াদেশ, যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণও বাড়তে পারে।

রফতানি বহুমুখীকরণের সুযোগ

বিশ্লেষকদের মতে, সিইপিএ শুধু তৈরি পোশাক খাতের জন্য নয়, বরং চামড়া, জুতা, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্লাস্টিক, হালকা প্রকৌশল এবং অন্যান্য মূল্য সংযোজিত শিল্পের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।

একইসঙ্গে বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে যৌথ উদ্যোগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সিইপিএ স্বাক্ষর নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে রফতানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির বিকল্প নেই। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উচ্চমূল্যের বাজারে ৯৭ শতাংশ পণ্যে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার বাংলাদেশের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, জুতা এবং নতুন সম্ভাবনাময় রফতানি খাতগুলো এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। তবে শুধু শুল্ক সুবিধা পেলেই হবে না। কোরিয়ার বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের নকশা, মান, দ্রুত সরবরাহ, টেকসই উৎপাদন এবং উদ্ভাবনে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কোরীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।’’

সামনে বড় সুযোগ, তবে প্রস্তুতিও জরুরি

বিশ্লেষকদের মতে, সিইপিএ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে শুধু শুল্ক সুবিধার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য, নকশা ও উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, দ্রুত কাস্টমস সেবা, বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার মতো বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সঠিক নীতি, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের রফতানি আগামী কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে সিইপিএ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।