ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করতে ২২ সদস্যের জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার। ব্যবসা পরিচালনায় সরকারি দপ্তরগুলোর দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা চিহ্নিত করে তা দূর করা, প্রয়োজনীয় আইন-বিধি ও নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ তদারকি এবং ব্যবসা সহজীকরণের সংস্কার রোডম্যাপ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে এই টাস্কফোর্স।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সভাপতি করে গঠিত এ টাস্কফোর্সে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।
রবিবার (৯ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ‘বিনিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা সহজীকরণ বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, টাস্কফোর্সটি অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।
টাস্কফোর্সের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন পরিবেশমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিব, নৌপরিবহন সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) রেজিস্ট্রার।
এছাড়া ব্যবসায়ী ও শিল্প খাতের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এফবিসিসিআই, এফআইসিসিআই, ডিসিসিআই, এমসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সভাপতিদের টাস্কফোর্সের সদস্য করা হয়েছে।
যেসব বিষয়ে কাজ করবে টাস্কফোর্স
ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন, লাইসেন্স, ছাড়পত্র, কর ও শুল্ক, ব্যাংকিং, পুঁজিবাজার, নির্মাণ, পরিবেশ এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের যেসব ধাপ ও জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলো চিহ্নিত করবে টাস্কফোর্স।
এসব ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো এবং সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিনিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসা সহজীকরণসংক্রান্ত খাতভিত্তিক সংস্কার রোডম্যাপ অনুমোদন এবং তা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করবে কমিটি।
সরকারি সেবায় একক সেবা কেন্দ্র বা ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা চালু, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন এবং অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও নীতিগত দিকনির্দেশনা দেবে টাস্কফোর্স।
এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে তৈরি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে— এমন আইন, বিধি, নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন ও প্রশাসনিক আদেশ সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাও চিহ্নিত করবে এই কমিটি।
ব্যবসায়ী ও সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি সেবা পেতে অযথা বিলম্ব, অনিয়ম এবং হয়রানির বিষয়গুলোও টাস্কফোর্সের নজরদারির আওতায় থাকবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতি তিন মাসে একবার পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে কমিটি সংশ্লিষ্ট অন্য কোনো ব্যক্তিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে।
সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য ২৭ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটি
এদিকে একই দিনে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে ২৭ সদস্যের ‘ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বিষয়ক জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি’ গঠন করেছে সরকার।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিটিতে সংস্কৃতি, শিল্প, বাণিজ্য, গৃহায়ণ, পরিকল্পনা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, পর্যটন, নারী ও শিশু, যুব ও ক্রীড়া এবং তথ্য ও সম্প্রচারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও সৃজনশীল শিল্পের প্রতিনিধিদেরও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), ব্র্যাক, এইচএসবিসি বাংলাদেশ, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি এবং ফ্যাশন ডিজাইনার ও মডেল খাতের প্রতিনিধিরা। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞদেরও কমিটিতে রাখা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (সামষ্টিক ও ভিটিডিয়াম) কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এই স্টিয়ারিং কমিটির মূল দায়িত্ব হবে সৃজনশীল অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের জন্য তৈরি রোডম্যাপ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও খাতভিত্তিক কমিটির মধ্যে সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
সৃজনশীল অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের কার্যক্রমের অগ্রগতিও প্রতি তিন মাসে পর্যালোচনা করবে স্টিয়ারিং কমিটি।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এই দুই কমিটির কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার ওপর।