একসঙ্গে ১৯ ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবা বন্ধ, ভোগান্তিতে পড়তে পারেন গ্রাহক

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে সিস্টেম উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক। এ কারণে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্ড, এটিএম, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআরসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে এবার একসঙ্গে ১৯টি ব্যাংকের এমন সেবা বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জরুরি সময়ে এটিএম থেকে টাকা তোলা, কার্ড দিয়ে কেনাকাটা কিংবা অনলাইন লেনদেন করতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেক গ্রাহক।

ব্যাংকগুলো বলছে, এটি স্থায়ী কোনও সমস্যা নয়। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ শেষ হলে নির্ধারিত সেবাগুলো আবার চালু হবে। গ্রাহকদের আগাম জানাতেও ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে এসএমএসসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছে।

সম্প্রতি ব্যাংক এশিয়া, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক তাদের প্রযুক্তিনির্ভর কিছু সেবা সাময়িক বন্ধ থাকার বিষয়ে গ্রাহকদের জানিয়েছে।

একসঙ্গে এত ব্যাংকের সেবা বন্ধ কেন

ব্যাংকগুলোর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ এবং কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের মতো কাজের জন্য এসব সেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েক ঘণ্টা, আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে কয়েক দিন ধরে কিছু সেবা বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কয়েকটি কার্ড ও লেনদেন সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।

এই সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এটিএম, কার্ড, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআর সেবার কোনোটি ব্যবহার করা যাবে না। ফলে গ্রাহকরা এটিএম থেকে টাকা তোলা, দোকানে কার্ড দিয়ে পেমেন্ট, কিউআর কোডে লেনদেন কিংবা অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে পারেন।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হতে পারে কোথায়

গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে জরুরি সময়ে নগদ টাকা প্রয়োজন হলে। নিজের ব্যাংকের এটিএম বা কার্ড সেবা বন্ধ থাকলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট ব্যাংকের কার্ড বা পিওএস সেবার ওপর নির্ভরতা বেশি, সেখানেও লেনদেনে সমস্যা হতে পারে।

অনলাইন কেনাকাটা, ই-কমার্স পেমেন্ট, কিউআর কোডের মাধ্যমে টাকা দেওয়া কিংবা অন্য ব্যাংকের হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও সাময়িক অসুবিধা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে একই সময়ে একাধিক ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকায় বিকল্প সেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে সব ব্যাংকের সব সেবা একই সময়ে বন্ধ থাকবে— বিষয়টি এমন নয়। কোন ব্যাংকের কোন সেবা কত সময় বন্ধ থাকবে, তা ব্যাংকভেদে আলাদা। ফলে গ্রাহকদের নিজ নিজ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি দেখে সেবা বন্ধের সময়সূচি জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

‘কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে ১৯ ব্যাংক’

একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যও পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবছর ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু সেবা বন্ধ রাখতে পারে।’ 

তিনি বলেন, ‘এবারও প্রতিটি ব্যাংক আলাদাভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে ১৯টি ব্যাংক একই সময়ের মধ্যে এ ধরনের কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে গেছে। এ কারণে বিষয়টি গ্রাহকদের নজরে এসেছে এবং কিছুটা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।’ 

আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘গ্রাহকদের কিছুটা ভোগান্তি হয়তো হতে পারে। আমরা প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছি— তারা তাদের গ্রাহকদের এ বিষয়ে জানিয়েছে কিনা, সচেতন করেছে কিনা।’

ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের এ বিষয়ে আগাম জানানো হয়েছে।

গ্রাহকের করণীয় কী 

ব্যাংকিং সেবা সাময়িক বন্ধ থাকার সময়ে গ্রাহকদের কিছুটা সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বড় ধরনের অনলাইন পেমেন্ট, জরুরি কার্ড লেনদেন বা নগদ টাকা তোলার প্রয়োজন থাকলে আগে থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখা ভালো।

গ্রাহকদের নিজ নিজ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, এসএমএস, অ্যাপ বা শাখা থেকে জানতে হবে ঠিক কোন সেবা কত সময় বন্ধ থাকবে। কারণ একই ব্যাংকের সব ধরনের সেবা বন্ধ নাও থাকতে পারে।

জরুরি প্রয়োজনে বিকল্প ব্যাংক হিসাব, অন্য কার্ড, মোবাইল আর্থিক সেবা কিংবা অন্য বৈধ লেনদেন ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া বিকল্প লেনদেন পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত ব্যাংক তথ্য, কার্ডের পিন, ওটিপি বা পাসওয়ার্ড দেওয়া উচিত নয়।

প্রযুক্তি উন্নয়নে সাময়িক ভোগান্তি

ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিস্টেম আপগ্রেড ও রক্ষণাবেক্ষণও নিয়মিত প্রয়োজন হয়। নিরাপত্তা বাড়ানো, লেনদেনের সক্ষমতা উন্নত করা এবং নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার জন্য অনেক সময় নির্দিষ্ট সেবা সাময়িক বন্ধ রাখতে হয়।

তবে একসঙ্গে বেশি সংখ্যক ব্যাংকের সেবা বন্ধ থাকলে গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বিশেষ করে বর্তমানে মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটা, বিল পরিশোধ, অনলাইন কেনাকাটা ও টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এ কারণে প্রযুক্তিগত কাজের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকদের সুবিধা, বিকল্প ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকগুলো অবশ্য জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই সিস্টেম মাইগ্রেশন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। কাজ শেষ হওয়ার পর গ্রাহকদের স্বাভাবিকভাবেই কার্ড, এটিএম, পিওএস, এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআরসহ সংশ্লিষ্ট সেবা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।

অর্থাৎ একসঙ্গে ১৯টি ব্যাংকের কিছু প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকলেও পুরো ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। তবে কোন গ্রাহকের কোন সেবা বন্ধ থাকবে, সেটি ব্যাংকভেদে আলাদা হওয়ায় আগাম বিজ্ঞপ্তি দেখে প্রয়োজনীয় লেনদেন পরিকল্পনা করাই হবে ভোগান্তি এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।