ব্যাংকের কার্ড-এটিএম সেবা বন্ধ, লাখ লাখ গ্রাহক ভোগান্তিতে

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলে একসঙ্গে দেশের ৩০টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে এসব সেবা বন্ধের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো পর্যাপ্তভাবে গ্রাহকদের জানায়নি— এমন অভিযোগ করেছেন অনেক গ্রাহক। ফলে হঠাৎ করে এটিএম, কার্ড, পিওএস, কিউআর ও অনলাইন লেনদেনের কোনও কোনও সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনের সময়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন তারা। 

বিশেষ করে জরুরি সময়ে টাকা তুলতে না পারা, কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়ে লেনদেন ব্যর্থ হওয়া এবং অনলাইন পেমেন্টে সমস্যার মুখে পড়ে অনেক গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, কয়েক দিন ধরে সেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি আগে থেকে জানানো হলে তারা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারতেন। 

ব্যাংকগুলো অবশ্য বলছে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণ এবং কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে নির্দিষ্ট কিছু সেবা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। কাজ শেষ হলে এসব সেবা স্বাভাবিক হয়ে যাবে।

হঠাৎ বন্ধ সেবা, বিপাকে গ্রাহক

রবিবার (৪ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ শুরু হয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগামী ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কিছু প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সীমিত থাকার কথা রয়েছে।

ব্যাংকগুলোর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এ সময়ে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের আওতাধীন এটিএম, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম), পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) এবং নির্দিষ্ট কার্ড সেবা বন্ধ থাকতে পারে। কোনো কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে এনপিএসবি, ই-কমার্স ও কিউআরভিত্তিক লেনদেনও সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়েছে।

তবে ডেবিট কার্ডের লেনদেনসহ সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা একযোগে বন্ধ হচ্ছে না। কোন ব্যাংকের কোন সেবা কখন বন্ধ থাকবে, তা ব্যাংকভেদে আলাদা।

সমস্যা তৈরি হয়েছে গ্রাহকদের একটি বড় অংশ বিষয়টি আগে থেকে না জানায়। অনেকেই প্রয়োজনের সময়ে এটিএমে গিয়ে টাকা তুলতে না পেরে বা কার্ড দিয়ে লেনদেন করতে গিয়ে সেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি জানতে পারেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন বেশ কিছু অভিযোগও দেখা গেছে। গ্রাহকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণের মতো পরিকল্পিত কাজ হলে তা আগে থেকে জানানো হলো না কেন।

‘আগে জানালে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারতাম’

ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ওপর মানুষের নির্ভরতা এখন অনেক বেড়েছে। দৈনন্দিন কেনাকাটা, হাসপাতাল ও চিকিৎসা ব্যয়, অনলাইন কেনাকাটা, বিল পরিশোধ কিংবা জরুরি প্রয়োজনে টাকা তোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বড় অংশ এখন কার্ড ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহার করেন।

এ কারণে কোনও সেবা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে গ্রাহকের দৈনন্দিন জীবনে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, কয়েক ঘণ্টার জন্য কোনও সেবা বন্ধ থাকলে হয়তো বিষয়টি সামাল দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কয়েক দিন ধরে কোনও সেবা বন্ধ থাকার তথ্য আগে থেকে না জানালে অনেকেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেন না। 

একাধিক গ্রাহক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, এটিএম বা কার্ড সেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি ব্যাংকের কাছ থেকে আগেই জানা থাকলে তারা অন্য ব্যাংকের কার্ড, নগদ টাকা কিংবা বিকল্প ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা করে রাখতে পারতেন।

কতগুলো ব্যাংকের সেবা বন্ধ

সম্প্রতি ব্যাংক এশিয়া, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক, কমিউনিটি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক তাদের প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন সেবা সাময়িক বন্ধ থাকার বিষয়ে গ্রাহকদের জানিয়েছে। 

ব্যাংকগুলোর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিরাপদ ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে সিস্টেম আপগ্রেড, রক্ষণাবেক্ষণ ও কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ করা হচ্ছে।

এ কারণে নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কিছু কার্ড, এটিএম, সিআরএম, পিওএস, ই-কমার্স, কিউআর কিংবা আন্তঃব্যাংক লেনদেন সেবা ব্যবহার করা যাবে না।

তবে সব ব্যাংকের সব সেবা একই সময়ে বন্ধ নয়। আবার একটি ব্যাংকের একটি সেবা বন্ধ থাকলেও অন্য সেবা চালু থাকতে পারে।

‘কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে ৩০ ব্যাংক’

একসঙ্গে এতগুলো ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বন্ধ থাকা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যও পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রতিবছর ব্যাংকগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিছু সেবা বন্ধ রাখতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এবার প্রতিটি ব্যাংক আলাদাভাবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে একসঙ্গে অনেক ব্যাংক একই সময়ের মধ্যে এ ধরনের কার্যক্রমের মধ্যে পড়ে গেছে।’ এ কারণে বিষয়টি গ্রাহকদের নজরে এসেছে এবং প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। 

আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘গ্রাহকদের কিছুটা ভোগান্তি হয়তো হতে পারে। আমরা প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছি— তারা তাদের গ্রাহকদের এ বিষয়ে জানিয়েছে কিনা, সচেতন করেছে কিনা।’ 

তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে কয়েক দিন সেবা বন্ধ রাখার বিষয়টি আরও স্পষ্ট ও দৃশ্যমানভাবে আগে জানানো প্রয়োজন ছিল।

ব্যাংক বলছে, এসএমএসে জানানো হয়েছে

ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গ্রাহকদের এসএমএসসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সেবা বন্ধ থাকার বিষয়টি জানানো হয়েছে। কোনও কোনও ব্যাংক তাদের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। 

তবে গ্রাহকদের একটি অংশের দাবি, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শুধু ওয়েবসাইট বা সীমিত সংখ্যক এসএমএসের মধ্যে রাখলে অনেক গ্রাহকের কাছে তা পৌঁছায় না। বিশেষ করে কয়েক দিন ধরে এটিএম, কার্ড বা পিওএস সেবা বন্ধ থাকার মতো বিষয় হলে গ্রাহকদের আগেই স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন। 

ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ বা সিস্টেম আপগ্রেডের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে গ্রাহকসেবা ব্যাহত হলে আগাম তথ্য দেওয়া ব্যাংকের গ্রাহকসেবা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি জরুরি লেনদেনে

গ্রাহকদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে জরুরি সময়ে নগদ টাকা প্রয়োজন হলে। নিজের ব্যাংকের এটিএম বা সংশ্লিষ্ট কার্ড সেবা বন্ধ থাকলে অন্য মাধ্যমে টাকা তোলার ব্যবস্থা করতে হয়।

একইভাবে দোকানে কার্ড দিয়ে পেমেন্ট, অনলাইন কেনাকাটা, ই-কমার্স পেমেন্ট, কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন কিংবা অন্য ব্যাংকের হিসাবে টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও কোনও কোনও গ্রাহক সমস্যায় পড়ছেন।

বিশেষ করে একসঙ্গে অনেক ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সীমিত থাকায় বিকল্প সেবার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

তবে ব্যাংকগুলোর দাবি, পুরো ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। যেসব সেবা সাময়িক বন্ধ রয়েছে, সেগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবার চালু হবে।

প্রযুক্তি উন্নয়ন জরুরি, গ্রাহককে জানানোও জরুরি

ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত সিস্টেম আপগ্রেড ও রক্ষণাবেক্ষণও প্রয়োজন। নিরাপত্তা জোরদার, লেনদেনের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করার জন্য ব্যাংকগুলোকে এসব কাজ করতেই হয়।

কিন্তু একই সঙ্গে গ্রাহকদের তথ্য জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পরিকল্পিতভাবে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন কোনো সেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হলে গ্রাহকদের পর্যাপ্ত সময় হাতে রেখে জানানো না হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে দৈনন্দিন লেনদেনে।

এ কারণে সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা সিস্টেম মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর উচিত হবে—কোন সেবা, কত সময় এবং কোন কোন গ্রাহক এতে প্রভাবিত হবেন, তা স্পষ্টভাবে আগেই জানানো।

গ্রাহকদের করণীয়

সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের নিজ নিজ ব্যাংকের এসএমএস, ওয়েবসাইট, অ্যাপ বা শাখা থেকে সংশ্লিষ্ট সেবার সময়সূচি জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

জরুরি লেনদেনের প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যাংক হিসাব, অন্য কার্ড, মোবাইল আর্থিক সেবা বা বৈধ অন্য কোনো লেনদেন ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে এ সুযোগে প্রতারণার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই কোনও অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কার্ডের পিন, ওটিপি, পাসওয়ার্ড বা ব্যাংকিং তথ্য দেওয়া যাবে না।

ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই সিস্টেম মাইগ্রেশন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো আগেই স্বাভাবিক হতে পারে।

অর্থাৎ একসঙ্গে ৩০টি ব্যাংকের কিছু প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সাময়িক বন্ধ থাকলেও পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি। তবে পরিকল্পিত এই সাময়িক অচলাবস্থায় গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে আগাম ও স্পষ্ট তথ্য দেওয়া কতটা জরুরি— এ ঘটনাটি আবারও সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।