বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রি করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড

বাংলাদেশে নিজেদের ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিং (ডব্লিউআরবি) ব্যবসা বিক্রির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। বৈশ্বিক ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক ব্যাংকটি। সম্ভাব্য বিক্রয় ও হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে। তবে এ সময়ে গ্রাহকদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম, আমানত ও বিনিয়োগে কোনো তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ব্যাংকটি এ তথ্য জানায়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের পাঠানো চিঠিতেও ব্যবসা বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

চিঠিতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ওয়েলথ অ্যান্ড রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের প্রধান লুৎফুল হাবিব জানিয়েছেন, ব্যাংকটির বৈশ্বিক কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি জানান, সম্ভাব্য হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলাকালে গ্রাহকদের আমানত ও বিনিয়োগ সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে। গ্রাহকরা আগের মতোই স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাংকিং লেনদেন চালিয়ে যেতে পারবেন। এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য বা অগ্রগতি হলে গ্রাহকদের নিয়মিত জানানো হবে।

ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য বিক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে চুক্তি ও অনুমোদনসহ পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগতে পারে।

রিটেইল ব্যবসা বিক্রি, করপোরেট ব্যাংকিংয়ে গুরুত্ব

রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির উদ্যোগ নিলেও বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে না স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড। বরং করপোরেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং (সিআইবি) ব্যবসার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ব্যাংকটি।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সীমান্তপারের লেনদেন, মূলধন প্রবাহ এবং অবকাঠামো অর্থায়নের মতো খাতে নিজেদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এনামুল হক বলেন, বাংলাদেশের বাজারে ব্যাংকটির কৌশলগত অগ্রাধিকার আরও সুনির্দিষ্ট করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মূলধন প্রবাহ ও অবকাঠামো অর্থায়নে বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বড় পরিসরে অবদান রাখার লক্ষ্য রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বাজার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করার বিষয়ে ব্যাংকটির প্রতিশ্রুতি আগের মতোই রয়েছে।

ব্যাংকটি জানিয়েছে, বাংলাদেশে ১২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করছে তারা। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, সীমান্তপারের লেনদেনের সুবিধা ও খাতভিত্তিক দক্ষতার মাধ্যমে ভবিষ্যতেও গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাবে।

ছয় ব্যাংকের আগ্রহ

এদিকে ব্যাংকিং খাতের নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা কিনতে দেশের ছয়টি বেসরকারি ব্যাংক আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্ভাব্য ক্রেতার তালিকায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পুবালী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, প্রতিষ্ঠিত গ্রাহকভিত্তি, উচ্চ আয়ের গ্রাহক, বড় আমানতভিত্তি এবং শক্তিশালী ক্রেডিট কার্ড ব্যবসার কারণে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং কার্যক্রম স্থানীয় ব্যাংকগুলোর কাছে আকর্ষণীয়।

একটি প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকের রিটেইল ব্যবসা অধিগ্রহণের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতারা নতুন গ্রাহক যুক্ত করার পাশাপাশি আমানত সংগ্রহ, ক্রেডিট কার্ড এবং অন্যান্য খুচরা ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ পেতে পারে।

তবে সম্ভাব্য ক্রেতাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোন ব্যাংক এ ব্যবসা অধিগ্রহণ করবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। এ ছাড়া সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য বা চুক্তির আর্থিক শর্ত সম্পর্কেও কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

গ্রাহকদের লেনদেন চলবে স্বাভাবিক নিয়মে

ব্যবসা বিক্রির ঘোষণা আসার পর গ্রাহকদের মধ্যে আমানত, বিনিয়োগ, কার্ড ও অন্যান্য ব্যাংকিং সেবা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের আশ্বাস, হস্তান্তর প্রক্রিয়া চলাকালে গ্রাহকরা আগের নিয়মেই ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়ায় গ্রাহকসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ব্যবস্থায় কার্যক্রম চালু থাকবে।

গ্রাহকদের জানানো চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, প্রক্রিয়াটির অগ্রগতি সম্পর্কে তাদের নিয়মিত তথ্য দেওয়া হবে। অর্থাৎ, বিক্রির ঘোষণা মানেই তাৎক্ষণিকভাবে হিসাব, আমানত বা ব্যাংকিং সেবা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর হয়ে যাওয়া নয়।

কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন

ব্যবসা বিক্রির সিদ্ধান্তে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক প্রভাব না পড়লেও রিটেইল ব্যাংকিং বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সম্ভাব্য হস্তান্তরের পর তাদের চাকরি, দায়িত্ব ও কর্মস্থলের কী পরিবর্তন হবে, তা এখনো বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি।

তবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড জানিয়েছে, হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত কর্মীদের ন্যায্য, স্বচ্ছ ও পেশাদার উপায়ে সহায়তা করা হবে। কর্মীদের কল্যাণ পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যাংকটির অন্যতম প্রধান বিবেচনা হিসেবে থাকবে।

এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্রেতা ব্যাংকের সঙ্গে কর্মীদের কীভাবে সমন্বয় করা হবে, বিদ্যমান চাকরির শর্ত বহাল থাকবে কি না এবং দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের প্রয়োজন হবে কি না—এসব বিষয় চূড়ান্ত চুক্তি ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

বৈশ্বিক কৌশলে পরিবর্তন

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির উদ্যোগ মূলত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যবসার অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণের অংশ। ব্যাংকটি এমন খাতে মূলধন ও ব্যবস্থাপনার মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে চায়, যেখানে তাদের বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বড় পরিসরে ব্যবসা বাড়ানো সম্ভব।

২০২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের সময় এবং ২০২৬ সালের মে মাসে বিনিয়োগকারীদের এক অনুষ্ঠানে ব্যাংকটি এ কৌশলগত অবস্থানের কথা জানিয়েছিল।

বাংলাদেশে রিটেইল ব্যাংকিং ব্যবসা বিক্রির সম্ভাবনা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি একদিকে সাধারণ গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নতুনভাবে নির্ধারণ করতে যাচ্ছে, অন্যদিকে করপোরেট ও বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে।

তবে পুরো প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষা, কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য হস্তান্তর নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার পরই এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।