বিশ্ববাজারে পোশাকের দাম বাড়লেও বাংলাদেশ বিক্রি করছে কম দামে 

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি–সেপ্টেম্বর) পোশাক আমদানি কমেছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকেও দেশটির পোশাক আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। তবে সামগ্রিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমার হার কম হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব কিছুটা বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের অধীন অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৫৬ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ।

এ সময়ে আমদানি করা পোশাকের পরিমাণ বা ভলিউম কমেছে ৮ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে প্রতি ইউনিট পোশাকের গড় মূল্য বেড়েছে ২ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ পোশাক আমদানির পরিমাণ কমলেও তুলনামূলক বেশি দামে পোশাক কিনেছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওটেক্সার তথ্য বলছে, আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি হয়েছে ৬ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম। এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির পরিমাণ কমেছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। পাশাপাশি প্রতি ইউনিট পোশাকের গড় দামও কমেছে শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ।

মাসভিত্তিক হিসাবেও বাংলাদেশের রফতানিতে ওঠানামা দেখা গেছে। চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক আমদানি ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছিল। তবে সেপ্টেম্বর মাসে তা আবার ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমে যায়।

তারপরও সামগ্রিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা ভালো। জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব গত বছরের ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ হয়েছে বলে ওটেক্সার তথ্যে জানা যায়।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিযোগী দেশের পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আলোচ্য সময়ে ভিয়েতনামের রফতানি বেড়েছে শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ২ দশমিক ৮১ শতাংশ।

অন্যদিকে বড় কয়েকটি সরবরাহকারী দেশ বাজার হারিয়েছে। এর মধ্যে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি কমেছে ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ, ভারত থেকে ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং পাকিস্তান থেকে ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

বিশেষ করে চীন ও ভারতের বাজারে বড় ধরনের পতন এশিয়ার পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার চিত্রকে আরও স্পষ্ট করেছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তুলনামূলক কম হারে বাজার হারালেও ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

দামেও পিছিয়ে বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পোশাকের গড় আমদানি মূল্য বাড়লেও এশিয়ার প্রধান সাতটি সরবরাহকারী দেশের মধ্যে পাঁচটির পোশাকের ইউনিট মূল্য কমেছে। এসব দেশের মধ্যে চীনের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য সবচেয়ে বেশি কমেছে, ৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া ছাড়া বাকি দেশগুলোর পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য কমেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই পতনের হার শূন্য দশমিক ৯৫ শতাংশ।

ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য এখন বিশ্ববাজারের গড় দামের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কম। গত বছর বাংলাদেশের পোশাকের গড় দাম বিশ্ববাজারের গড় দামের কাছাকাছি ছিল।

অর্থাৎ শুধু রফতানির পরিমাণ নয়, পোশাকের বিক্রয়মূল্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের গড় দাম বাড়লেও বাংলাদেশের পণ্যের ইউনিট মূল্য কমে যাওয়ায় রফতানি আয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির বাজারে চাহিদা কমার প্রভাব পড়েছে প্রায় সব প্রধান সরবরাহকারী দেশের ওপর। তবে দেশভেদে এ প্রভাবের মাত্রা ভিন্ন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমদানি কমার হার সামগ্রিক বাজারের তুলনায় কম হলেও রফতানির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং পোশাকের গড় বিক্রয়মূল্য বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সামগ্রিকভাবে পোশাক আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব বাংলাদেশের রফতানিতেও পড়েছে। তবে বাংলাদেশের রফতানি কমার হার সামগ্রিক বাজারের তুলনায় কম হওয়া ইতিবাচক দিক। এতে বোঝা যায়, প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা রয়েছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়ানো নয়, পোশাকের গড় বিক্রয়মূল্য বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে। বাংলাদেশের পোশাকের ইউনিট মূল্য বিশ্ববাজারের গড় দামের চেয়ে কম থাকা উদ্বেগের বিষয়। পণ্যের বৈচিত্র্য, উন্নত মান, নতুন ডিজাইন ও উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়িয়ে ভালো দাম নিশ্চিত করতে হবে।’’