‘শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে’  

প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহি চৌধুরী বীর বিক্রম বলেছেন, ‘জ্বালানি সাশ্রয়ে ছোট-বড় সব ধরনের শিল্প কারখানায় যেতে হবে। এ জন্য এনার্জি অডিট করতে হবে। সরকারকে শিল্পমালিকদের সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’

শনিবার (২৭ মার্চ) এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিন আয়োজিত এনার্জি ইফিসিয়েনসি অপরচুনিটি ইন আরএমজি অ্যান্ড টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি শীর্ষক এক ওয়েবিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘শিল্পে জিরো ওয়েস্ট সিস্টেম আমাদের শিখতে হবে। আমাদের মতো ঘনবসতির দেশে এই ধরনের আইডিয়া কাজে লাগানো দরকার। নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে আসা প্রয়োজন। জ্বালানি সাশ্রয়ে আমরা এমনভাবে এগিয়ে যেতে চাই, যাতে করে পৃথিবীর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘যারা অডিট করবে, যার ফাইনেন্স করবে, যারা ফাইন্যান্স নেবে তাদের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। বিশেষ করে নতুন বিনিয়োগকারীরা যারা আসবে তাদের আগ্রহী করা খুব জরুরি।’

তৌফিক ই ইলাহি চৌধুরী বলেন, ‘এসব খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলা নিজেরা তেমন উৎসাহিত হয় না। তাদের অফিসারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, ব্যবসায়ীদের কাছে যাওয়া  এবং বুঝানো প্রয়োজন। সবাই মিলে কাজ করতে হবে। একটা নীতিমালা করা, ট্রেনিং দেওয়া এইগুলাও কাজ। তবে মূল কাজ বাস্তবায়ন করা।’

ওয়েবিনারে স্রেডার সদস্য ফারজানা মমতাজ মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।  তিনি বলেন, ‘টেক্সটাইল ও গামেন্ট সেক্টরে জ্বালানি সাশ্রয় করা গেলে মোট সাশ্রয় ১৭ দশমিক ৬ ভাগে নেমে আসবে। সরকার ২০১৬ সালে জ্বালানি সাশ্রয়ী পরিকল্পনা করেছে। এ জন্য অনেকগুলা নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। এনার্জি অডিট প্রোগ্রাম দ্রুত শুরু করা দরকার। যেসব শিল্প কারখানায় জ্বালানির ব্যবহার বেশি তাদের তালিকা করা হচ্ছে। তাদের সঙ্গে স্রেডা কথা বলে জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে কথা বলবো। জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করার জন্য ক্যাম্পেইন করতে হবে। জিআইজেড এর সহায়তায় পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তরুণদের লক্ষ্য করে কাজ করতে চাইছে স্রেডা। সচেতনতা বাড়াতে স্টিকার,  টিভি বিজ্ঞাপনসহ আরও বেশ কিছু কাযক্রম হাতে নেওয়া হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা এই প্রচার নিয়ে যেতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য আলাদা অর্থের প্রয়োজন। যাতে শিল্পমালিকরা আগ্রহী হয় সেজন্য আলাদা লোনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারা জ্বালানি সাশ্রয়ী যন্ত্রাংশ ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়। সেটা আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। জ্বালানি সাশ্রয়ে মনিটরিং ডাটা তৈরি করছি আমরা।’

ওয়েবিনারে বক্তারাঅধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রেনিং এর পাশাপাশি সফলতা, কেসস্টাডি, পরামর্শ নিয়ে বই আকারে শিল্প মালিকদের দেওয়া দরকার। এতে আগ্রহ বাড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংককের গ্রিন ফাইনেন্সিংয়ের বিষয়ে জানা দরকার। এতদিন ধরে কাকে দিয়েছে, কোনও মনিটরিং করা হয়নি। মনিটরিং দরকার তাতে হয়তো বিনিয়োগ বাড়বে।’

বিজিএমইএ এর প্রেসিডেন্ট রুবানা হক বলেন, ‘শিল্পে জ্বালনি সাশ্রয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছি। এখাতে আরও বেশি কারখানাকে আগ্রহী করা দরকার। বর্তমানে বিশ্বের সবুজ কারখানাগুলোর মধ্যে ৭টু গ্রিন ফ্যাক্টরি এখন বাংলাদেশে আছে। তবে এতে খুব বেশি খুশি হওয়ার কিছু নেই। আমাদের বড় কারখানাগুলোতে যত মনোযোগ দেওয়া হয়, ছোট বা এসএমইতে তত মনোযোগ দেওয়া হয় না। এই বিষয়ে স্রেডার সঙ্গে এক হয়ে কাজ করতে যাচ্ছি আমরা। খুব শিগগিরই তাদে সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করবে বিজিএমইএ।’  

তিনি বলেন, ‘শিল্পে জ্বালানি সাশ্রয়ে বিনিয়োগ বড় বিষয়। গ্রিন ফাইনেন্সিং এর বিষয়টি আরও ভালোভাবে আসা দরকার। সাশ্রয়ের নতুন নতুন যন্ত্রাংশ আসছে, সেটিও আমাদের দেখতে হবে। ছোট ছোট কারখানাগুলোকে নিজেরা যাতে উদ্যোগী হয়, সে বিষয়ে কাজ কর‍তে হবে। এ জন্য উৎসাহ দিতে বিশেষ অবদানের জন্য পুরষ্কার দেওয়া যেতে পারে।  সবুজ বিপ্লব শুধু শহরে নয়, সারাদেশেই হওয়া দরকার।’

জিআইজেড এর সিনিয়র অ্যাডভাইজার শফিকুল আলম আরেকটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেখানে তিনি গার্মেন্টস এর জ্বালানি সাশ্রয়ের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সাশ্রয়ে বিজিএমইএ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বিজিএমইএ রুফটপ সোলারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। গামেন্ট এ যদি রুফটপ সোলার বসানো যায় তাহলে এটি জ্বালানি সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।’

জিআইজেড প্রোগ্রাম কোঅডিনেটর মোতাব্বির বিন আনাম বলেন, ‘জ্বালানি সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে শিল্পে এনার্জি ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে। শিল্পে আমাদের আগের চেয়ে জ্বালানির ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সাশ্রয়ের বিষয়ে আমাদের জানার অনেক ঘাটতি আছে। তাই এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজন।’

বিজিএমইএ এর পরিচালক আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ‘বিশেষায়িত শিল্প এলাকায় বিল্ডিংগুলোর ছাদ অনেক বড়,  সেখানে রুফটপ সোলারে যাওয়া যাবে। এখানে যে ঋণ দেওয় হয় সেটা যদি আর্ও আকর্ষণীয় করা যায় তাহলে এটি বাড়বে। জ্বালানি সাশ্রয়ে কেন যেতে হবে সেটা জানানো প্রয়োজন। প্রাকৃতিক গ্যাস কমছে। তাই আমাদের সাশ্রয় করতেই হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে।’

ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য রাখেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. জহুরুল হক, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সালেক সুফি, ইডকলের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার নাজমুল হক।