বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে জ্বালানির স্থায়ী সমাধানে যেতে হবে। পাশাপাশি সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ দিতে হলে অবশ্যই গ্যাস দিয়েই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে। অন্যসব জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে তা করতে হবে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় উৎপাদনের জন্য। সঠিক পরিকল্পনা ও যথা সময়ে বাস্তবায়ন করা না গেলে কোনোভাবে কমানো যাবে না বিদ্যুতের দাম।
শনিবার (২৮ আগস্ট) জ্বালানি বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স অব বাংলাদেশের (এফইআরবি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা: স্থাপিত এবং সরবরাহ সক্ষমতা’ শীর্ষক এক ওয়েবমিনারে বক্তারা এসব তথ্য জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, জ্বালানিখাতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় না হলেই বিপদ। ওভার প্ল্যানিং আরও বড় সমস্যা হয় অনেক সময়। বিদ্যুৎ বিভাগে এক সময় ওভার প্ল্যানিং করা হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ যে অবস্থায় আছে সেখানে ওভার প্ল্যানিং করলে কোনও সমস্যা হয় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু নিজস্ব অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে না, অন্য দেশের অর্থনীতিও আমাদের দেশে প্রভাব ফেলে। আজকেই এই অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে বিশ্বের বহু দেশ এখন আমাদের প্রতি আগ্রহী, আমাদের দেশে বিনিয়োগ করতে চায়।
তিনি বলেন, কোভিড সংক্রমণের মধ্যেই গত জুলাই মাসে লকডাউনের মধ্যে শহরে কলকারখানা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা কমে আসে। কিন্তু একই সময়ে দেখা যায় গ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা কিন্তু বেড়ে যায়। ফলে আমাদের গ্রামগুলোতেও এখন বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে।
কায়কাউস বলেন, আমাদের চাহিদা এবং চাহিদার পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানোর কথা বিবেচনা করে বিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। কিন্তু সরকারের চেয়ে এখন এইখাতে বেসরকারি অনেক কোম্পানিই বিনিয়োগ করতে পারে। এখন দেশে বেশ কিছু এ ক্লাস বেসরকারি কোম্পানি গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, আমাদের চিন্তা করা উচিত বিদ্যুতের দাম কেন বাড়ছে। কীভাবে এটি কমানো যায়। শিল্প মালিকরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পান না বলেই নিজেরা ক্যাপটিভ করেন। এদিকে গ্রিডের বিদ্যুৎ পড়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুতের দাম অবশ্যই বাড়বে, সব দেশেই বাড়ছে। জ্বালানির কারণেই এই দাম বাড়ে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি আমরা কেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বাড়াই তাহলে সেই সুবিধা সবাই নেবে। তাই আমাদের সাশ্রয়ী জ্বালানি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করাও খুবই প্রয়োজন।
ওয়েবিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ম. তামিম।
তিনি বলেন, বর্তমানের বেশি দামের জ্বালানির দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে আমাদের বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ছে। একই কারণে বাড়ছে আমাদের ভর্তুকিও।
তিনি আরও বলেন, যেসব জ্বালানি দিয়ে আমরা এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি তার একটি বড় অংশ গ্যাস হলেও সঙ্গে আছে বেশি দামের তেল, কয়লা এবং এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে এলএনজি। বিশ্ব বাজারের দিকে তাকালে বোঝা যায় আমরা যেসব জ্বালানি আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি তার দাম বেড়েই চলেছে। ফলে একই কারণে বাড়বে বিদ্যুতের দামও। আগামীতেও বাড়তেই থাকবে যদি না আমরা একটি নির্দিষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানি পরিকল্পনা করি। আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি। দুই, পাঁচ এবং দশ বছর মেয়াদি এসব পরিকল্পনা করার সময় জ্বালানির দামকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। বিদ্যুতের দাম কমতে হলে ল্যান্ডবেইজ এলএনজি এবং গ্যাসের অনুসন্ধানের বিকল্প নেই। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ বাদ দিয়ে ডিজেল দিয়েই করতে হবে। স্ট্যান্ডবাই বিদ্যুৎ রাখতেও হবে। শীতকালে বসে থাকে, সেটাও রাখতে হবে। তবে তা তেলের হবে এবং নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট হতে হবে। দাম বাড়বে এটার কোনও সন্দেহ নেই। বিদ্যুতের দাম কমিয়ে আনতে হবে।
এফইআরবির নির্বাহী পরিচালক শামীম জাহাঙ্গীরের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বিদ্যুৎ সচিব হাবিবুর রহমান, পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহম্মদ হোসেইন, পিডিবির চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন, পিডিবির কোম্পানি এফেয়ার্স মাহবুবুর রহমান, ডেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাউসার আমীর আলী, ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান, পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম কিবরিয়া, আরইবির চেয়ারম্যান মুইন উদ্দিন, বিপপার সভাপতি ইমরান করিম এবং এফইআরবির চেয়ারম্যান অরুণ কর্মকার বক্তব্য রাখেন।