দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা (পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান) প্রণয়নে এবার প্রাথমিক জ্বালানির সংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬’ প্রণয়নে জ্বালানির সংস্থানকে গুরুত্ব না দেওয়াতে সেটি ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এবার সেই সংকট দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) দেশের পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে সহায়তা করে। এর আগে ২০১০ এবং ২০১৬ সালে মাস্টারপ্ল্যানটিতে বিদ্যুতের চাহিদা এবং চাহিদা পূরণের বিষয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোন জায়গা থেকে প্রাথমিক জ্বালানি আসবে সেই চিন্তা করা হয়নি। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রাপ্যতা অনুযায়ী জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের নীতি এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেল সূত্র বলছে, ২০১০ এবং ২০১৬ সালে বলা হয়েছিল দেশে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে তার অর্ধেক আসবে কয়লা থেকে। এই কয়লার মধ্যে দেশের কয়লা ব্যবহার করে চাহিদার অন্তত ২৫ ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে দেশীয় কয়লা তোলার বিষয়টি আর আলোর মুখ দেখেনি। সরকারের তরফ থেকে কৃষি জমি এবং পরিবেশ নষ্ট করে কয়লা তোলা হবে না বলে জানানো হয়। পরবর্তীতে সরকারের তরফ থেকে মাস্টারপ্ল্যান পর্যালোচনা করে জানানো হয় কয়লার পরিবর্তে এলএনজি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। কিন্তু এই এলএনজির সংস্থান হবে কিভাবে, কোথায় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও ধারণা দেওয়া হয়নি। ফলে কাটাছেঁড়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এখন সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে নতুন যে মাস্টারপ্ল্যানটি করা হচ্ছে সেটি ২০৫০ সালকে মাথায় রেখে করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংস্থানকে মাথায় রাখা হচ্ছে। বলা হচ্ছে বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছ। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোটামুটি চার ধরনের জ্বালানি ব্যবহার হবে। যার মধ্যে রয়েছে কয়লাও। দেশীয় উৎসের পাশাপাশি আমদানি করা কয়লাও ব্যবহার হবে। তবে দেশীয় উৎস হিসেবে একমাত্র বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিকে ব্যবহার করা হবে। বড়পুকুরিয়া খনির কয়লাও ফুরিয়ে এসেছে। সেখানে একটি কেন্দ্র চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এখন আমদানি করা কয়লাই ব্যবহার করতে হবে। যদিও সরকার পরিবেশের কথা মাথায় রেখে দেশের নতুন নেওয়া কয়লা প্রকল্পগুলো বাতিল করছে। কেবল যে প্রকল্পগুলোর কাজ চলছে তার বাইরে আর কয়লাচালিত কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে না।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেলের ব্যবহারও কমিয়ে আনার চিন্তা করা হচ্ছে। অত্যধিক উৎপাদন খরচের জন্য তেল নির্ভরতা কমানো হচ্ছে। এর বাইরে প্রাকৃতিক গ্যাসের দেশীয় এবং আমদানি করা এলএনজি ব্যবহার হবে। নতুন গ্যাস না পাওয়া গেলে ২০৩০ এর পর উল্লেখযোগ্য দেশীয় গ্যাস পাওয়া সম্ভব নয়। সঙ্গত কারণে আমদানি নির্ভরতার দিকেই ঝুঁকছে দেশ। ইতোমধ্যে এলএনজির নতুন সংস্থানের চেষ্টা করছে সরকার।
তবে সব চাইতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। সৌর, বায়ুর পাশাপাশি অ্যামোনিয়া এবং হাইড্রোজেন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিন্তা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশে হাইড্রোজেন দিয়ে গাড়ি চালানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। বিশ্বের ভবিষ্যৎ জ্বালানি হিসেবে হাইড্রোজেনকেই এগিয়ে রাখা হচ্ছে। পানি থেকে হাইড্রোজেন আলাদা করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের গবেষণায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন সরকার। ট্রিলিয়ন ডলারের এই গবেষণা সফল হলে জ্বালানি সংকটের সমাধান হওয়ার আশা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দক্ষিণ করিয়া হাইড্রোজেন দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। যদিও এখনও এটি পরীক্ষামূলক বিষয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগের পরিকল্পনাগুলোতে জ্বালানির পরিকল্পনা ছিল না। আগে তো আমাকে ভাবতে হবে সামনে কী জ্বালানি আমরা ব্যবহার করবো। কিভাবে সেই জ্বালানির সংস্থান হবে এবং পাশাপাশি সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে তাও আমরা এবার ভাবছি। একই কারণে তাই বদলে যেতে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনাও। আমরা কয়লাকে আর বাড়াতে চাইছি না। অন্যদিকে বড় কেন্দ্রগুলো আসতে শুরু করলে ছোট ছোট কেন্দ্রগুলোর বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এবার বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একইসঙ্গে পরিবহনের জ্বালানির ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর কথা চিন্তা করছি আমরা। তিনি বলেন, একইভাবে গ্যাসের ক্ষেত্রেও আমদানি করা এলএনজি কিভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হবে তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির কথাও আমরা ভাবছি। যেমন, হাইড্রোজেন বা অন্য কোনও জ্বালানির কথা আমরা ভাবছি।