সার-বিদ্যুতেই বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকার গ্যাস বিল

বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন খাতে ১৮ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকার গ্যাস বিল আটকা পড়েছে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা)। দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে ধাপে ধাপে জমে গেছে এই বকেয়া। বিপুল অঙ্কের বকেয়া নিয়ে ধুঁকছে সংস্থাটি। এতে পুরো জ্বালানি খাতে আর্থিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২৭ জুন জ্বালানি খাত নিয়ে এক বৈঠক হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কাছে পেট্রোবাংলার বকেয়ার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, ৯ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকা। এছাড়াও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে ৬ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা এবং সার কারখানাগুলোর কাছে ২ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা বকেয়া পড়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ করে থাকে পেট্রোবাংলার কোম্পানিগুলো। গ্যাস বিল থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশ মুনাফা হিসেবে কেটে রেখে পেট্রোবাংলাকে অর্থ পরিশোধ করে তারা। পেট্রোবাংলা আবার এই অর্থ দিয়ে বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করে। একইসঙ্গে দেশের যেসব কোম্পানি গ্যাস উত্তোলন করে তাদের গ্যাসের দামও পরিশোধ করে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে দেশে যেসব আন্তর্জাতিক কোম্পানি গ্যাস উত্তোলন করে তাদের বিলও পরিশোধ করে।

এখন গ্যাসের বিল বকেয়া থাকায় পেট্রোবাংলা দেশের কোম্পানিগুলোর বিলও পরিশোধ করতে পারছে না। কোনও কোনও আন্তর্জাতিক কোম্পানি দেশে কাজ পাওয়ার সুযোগ পেলেও তারা বিনিয়োগ করছে না। গ্যাসের বিল বকেয়া পড়ায় বিনিয়োগ করতে পারছে না।

সূত্র জানায়, গত বছরের শুরু থেকে আর ঠিকমতো গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে পারেনি পিডিবি এবং অন্য বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। সরকার প্রতি মাসে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি বাবদ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড় করে, কিন্তু গত বছরের শুরু থেকেই মাসে মাসে এই অর্থ ছাড়ের পরিমাণ নেমে আসে হাজার কোটিতে। ফলে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির অর্থ আটকে পড়ায় বিদ্যুৎ বিভাগ গ্যাসের বিল দিতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।

সম্প্রতি জ্বালানি বিভাগের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুতের রাজস্ব আয় থেকে একটি অংশ বকেয়া পরিশোধে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে শিগগিরই বিদ্যুৎ বিভাগে চিঠি দেওয়া হবে। বকেয়ার বিষয় নিয়ে ইতোমধ্যে জ্বালানি বিভাগ অর্থ বিভাগে যোগাযোগ করেছে।

এদিকে গ্যাসের বকেয়া বিলের বিষয়ে গত ৪ জুন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় সার শ্রেণিতে গ্যাসের মূল্য বাবদ ১৬ টাকা হারে পরিশোধের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সার কারখানায় গ্যাসের বিল একবারে ৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ঘনমিটারপ্রতি ১৬ টাকা করা হয়।

কিন্তু বাংলাদেশে কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জানিয়েছে, সার শ্রেণিতে গ্যাসের দাম পরিশোধ করতে হবে। অতিরিক্ত বকেয়া কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে পরিশোধ করা হবে। এ লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ভর্তুকি নীতিমালায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ সার খাতে সরকার যে ভর্তুকি দেয় সেখান থেকেই অতিরিক্ত গ্যাস বিলের অর্থ আসবে বলে জানা যায়।

জ্বালানি সচিব নূরুল আমিন বিভাগের একটি বৈঠকে এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার নির্দেশ দেন। 

একই বৈঠকে তিতাস গ্যাস বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুনুর রশিদ মোল্লাহ জানান, ঘোড়াশাল পলাশ সার কারখানা থেকে ১৬ টাকা হারে (প্রতি ঘনমিটার) গ্যাসের বিল পরিশোধ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, বিপুল পরিমাণ গ্যাসের বিল বকেয়া পড়ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই বিপুল পরিমাণ বকেয়া থাকায় কোনও পদক্ষেপও নেওয়া যাচ্ছে না। আবার তারা বকেয়া পরিশোধও করতে পারছে না। এজন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনার জন্য আমরা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছি। একইসঙ্গে অর্থ বিভাগেও যোগাযোগ করেছি।

এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা ও পিডিবি চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে কয়েকবার ফোনকল করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অফিসে গিয়েও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।