ভাদ্রের গরমের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) হিসাব বলছে, ঘণ্টা প্রতি লোডশেডিং কোনও কোনও সময় দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তবে বাস্তবে বা বিতরণ কোম্পানির হিসাবে দেখা যাচ্ছে, লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি। কোনও কোনও জেলা থেকে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) জেনারেল ম্যানেজাররা বলছেন, তারা চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ কম পাচ্ছেন।
হঠাৎ করে কেন এই লোডশেডিং– এর কারণ জানতে গিয়ে মোটা দাগে দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমটি হলো, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সংকট। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ভাদ্রের তীব্র গরমে কুলিং লোড বেড়ে যাওয়া। প্রতি বছর গ্রীষ্মের পর শরতের এই সময়ে অর্থাৎ ভাদ্র মাসে তাপমাত্রা বেড়ে যায়, যা সামাল দিতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়। এবার ভাদ্রের এই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
উৎপাদন স্বল্পতায় লোডশেডিং
গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাত ১টা থেকে আজ মঙ্গলবার দুপুর ১টা পর্যন্ত পিজিসিবির হিসাবে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ২৯৩ মেগাওয়াট। ওই সময় ১৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ১২ হাজার ৮৯৯ মেগাওয়াট। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই চাহিদা অন্তত আরও ২৫০০ মেগাওয়াটের মতো বেড়ে যায়। ওই সময় তেলচালিত কেন্দ্রগুলো চালানো হলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ে।
কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। আজ মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ছিল ৩ হাজার ৫৪৬ মেগাওয়াট। একমাত্র পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া অন্য কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্রই পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না।
দেশে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের তিনটি এবং ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে যেগুলো কয়লায় চলে। এর বাইরে বড়পুকুরিয়ায় একটি ৫২২ মেগাওয়াট এবং বরগুনার তালতলিতে একটি ৩৫০ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া ভারতের আদানি পাওয়ার তাদের গোড্ডা ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রর পুরো বিদ্যুৎ বাংলাদেশে সরবরাহ করে।
অন্যদিকে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রও উৎপাদন কমিয়েছে। বিশেষ করে সামিট গ্রুপের এলএনজি টার্মিনালটি, যেটি তিন মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ আছে, সেটি আবার চালু না হওয়ায় দৈনিক অন্তত ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। আজ দুপুর ১২টায় গ্যাস চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার ২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। সাধারণত এখান থেকে ৬ থেকে সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন দিনের বেলায়ও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো হচ্ছে। এরপরও লোডশেডিং কমানো যাচ্ছে না।
মঙ্গলবার রংপুরের রাজারহাটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস৷ রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার আব্দুর নুর জানান, তাদের এলাকায় এ দিন বিকেল ৫টায় চাহিদা ছিল ৮৯ মেগাওয়াট, বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে ৬৫ মেগাওয়াট, আর লোডশেডিং ছিল ২৪ মেগাওয়াট। ঘাটতি মেটাতে দিনে প্রায় ৩ থেকে ৪ বার লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সংকটের আরেক কারণ কুলিং লোড
গরম বাড়লে সঙ্গে মানুষের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহারও বাড়তে থাকে। দেশে এমন কুলিং লোডের পরিমাণ রয়েছে ৩ হাজার মেগাওয়াটের মতো। গরম পড়লেই মানুষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে দেয়, এতে করে বিদ্যুতের ব্যবেহার বেড়ে যায়। বছরের যে সব সময়ে কুলিং লোড কম থাকে ওই সময়গুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ অনেকটা স্বাভাবিক থাকে।
হঠাৎ কেন এই হাল
বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রাথমিক জ্বালানির খুব সামান্য অংশ হলো গ্যাস, আর এই গ্যাসটা আসে দেশের গ্যাসক্ষেত্র থেকেই। এর বাইরে এলএনজি, তরল জ্বালনি (ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল) এবং কয়লা আমদানি করা হয়। দেশের বড় যেসব কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে সেগুলোর সবকটিই এখন অর্থ সংকটে আছে। সরকার দিনের পর দিন বিদ্যুৎ নিলেও কোম্পানিগুলোকে বিল পরিশোধ করছে না। এমনকি কোম্পানিগুলোকে কয়লা কেনার মতো পর্যাপ্ত অর্থও সরবরাহ করা হচ্ছে না। এ কারণে প্রত্যেকটি কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সংকটের প্রধান কারণ জ্বালানি। আমাদের জ্বালানি কেনার জন্য পর্যাপ্ত ডলার সরবরাহ করা হচ্ছে না। আমাদের বিল পরিশোধ করা হলে এবং জ্বালানি কেনার জন্য ডলার দিলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
বকেয়া বিলের জন্য ভারতের চাপ
ভারত বাংলাদেশে প্রতিদিন ২ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রফতানি করতে পারে। এর মধ্যে গোড্ডা পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে আসে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বাকিটা ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরবরাহ করা হয়। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে এই বিদ্যুৎ বাণিজ্যে প্রধান সংকট এখন বকেয়া বিদ্যুৎ বিল। ভারতের আদানি ও দেশটির সরকার মিলিয়ে বাংলাদেশের আছে ১০০ কোটি ডলার পাবে। এর মধ্যে আদানির বকেয়া রয়েছে ৮০ কোটি ডলার। আদানি বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখলেও সম্প্রতি বকেয়া পরিশোধে বাংলাদেশকে চাপ দিয়েছে– এই খবর ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। তবে এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি।
ঢাকার কী অবস্থা
মঙ্গলবার দিনের বেলা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) চাহিদা ছিল ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে তারা সরবরাহ পেয়েছে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা লোড ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে কাজ করছি, গ্রাহকদের যাতে কোনও সমস্যা না হয় সেটি মাথায় রাখছি। তাও সব এলাকায় দিনে অন্তত দুইবার এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। প্রায় ২০০ মেগাওয়াট ঘাটতি হচ্ছে৷ সন্ধ্যায় এই ঘাটতি আরও কিছুটা বাড়বে।
অন্যদিকে ঢাকা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) এক কর্মকর্তা জানান, তাদের চাহিদা ১ হাজার ৩৩৭ মেগাওয়াটের। এর মধ্যে পেয়েছেন ১ হাজার ১৭৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ গড়ে দিনে আজ ঢাকায় অফিসিয়াল লোডশেডিং ছিল ৩৬০ মেগাওয়াট।
যা বলছেন ভোক্তারা
রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা বলছেন, কখনও কখনও প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একবার লোডশেডিং হচ্ছে। দিনের তুলনায় গভীর রাতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বেশি। এত লোডশেডিং হওয়ায় তীব্র গরমে হাঁসফাঁস দশা মানুষের।
রাজধানীর শান্তিনগরের বাসিন্দা অনিন্দিতা বর্না জানান, গতকাল রাত ১টায় বিদ্যুৎ গেছে আর এসছে রাত ২টায়। ঠিক যখন মানুষ ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয় তখন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়াটা খুব একটা সুখকর বিষয় না।
জানতে চাইলে রাজধানীর বনশ্রী ডি ব্লকের বাসিন্দা মৌসুমি মৌ বলেন, হঠাৎ বিদ্যুতের আসা-যাওয়া এতটা বেড়ে গেছে। আমার এলাকায় একবার বিদ্যুৎ গেলে কখনও কখনও এক ঘণ্টা, আবার কোনও কোনও সময় দেড় ঘণ্টা পরও আসে।