সার কারখানায় বাড়তি গ্যাস পেতে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে। পেট্রোবাংলা সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) জানিয়েছে—ইতোমধ্যে সার কারখানায় সরবরাহ করা গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। এখন বিইআরসি বাড়তি দাম অনুমোদন করলেই তা কার্যকর হবে।
বিইআরসি সূত্র বলছে, সাধারণত গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবগুলোতে একইসঙ্গে সব শ্রেণির গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হতো। কিন্তু এবারই প্রথম সার-শ্রেণিকে আলাদা করে পেট্রোবাংলাসহ সব গ্যাস বিতরণ কোম্পানি বিশেষ এই প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এতে বলা হয়, বাড়তি দাম ছাড়া সার কারখানায় অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ সম্ভব না। তাও সেই গ্যাসের দাম হবে প্রতি ঘনমিটার ৪০ টাকা। বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৬ টাকা। এক লাফে ২৪ টাকা বাড়ানোর কারণ হিসেবে পেট্রোবাংলা এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে—নতুন গ্যাসের সংস্থান করতে হলে এলএনজি আমদানি করতে হবে। সে জন্য বছরে যে আর্থিক ব্যয় বাড়বে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনকে (বিসিআইসি) তা পরিশোধ করতে হবে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, সার কারখানায় ২০১৯ সালে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয় ৪ টাকা ৪৫ পয়সা। এরপর ধারাবাহিকভাবে কয়েক ধাপে দাম বাড়িয়ে বর্তমান দাম ঘনমিটার প্রতি ১৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বিসিআইসি গ্যাসের বাড়তি দাম পরিশোধ করা থেকে বিরত থাকে। সার কারখানার লোকসানের অজুহাতে এমনটি করেছিল বিসিআইসি। গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো পেট্রোবাংলা, জ্বালানি বিভাগ, এমনকি সরকারের আরও উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেও বিসিআইসি থেকে বাড়তি অর্থ আদায় করতে পারেনি। তবে সে সময় গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে সারের ওপর বাড়তি চাপ নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দেওয়া হবে বলে বিইআরসি জানিয়েছিল।
এখন পেট্রোবাংলা এবং গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে— সেখানে বলা হয়েছে, বিসিআইসি বন্ধ সার কারখানা চালু করতে চায়। এ জন্য তারা বাড়তি গ্যাস চাইছে। বিদ্যুৎ, শিল্প এবং অন্যান্য খাতে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে বছরের বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন হারে গ্যাস সরবরাহ করে পেট্রোবাংলা।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়, বছরের নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পযন্ত গড়ে দৈনিক ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), মার্চ ও অক্টোবরে ১৬৫ এমএমসিএফডি এবং এপ্রিল-সেপ্টেম্বরে ১৩০ এমএমসিএফডি করে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে দেখা গেছে, গত এক বছরে গড়ে সার শ্রেণিতে প্রতিদিন ১১৬ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহের অভাবে বিপুল ব্যয়ে স্থাপিত সার কারখানাগুলো বছরের বেশির ভাগ সময়ে বন্ধ থাকছে। ফলে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে সার আমদানি করতে হচ্ছে। বিসিআইসি বলছে, দেশে সার উৎপাদন করা হলে আমদানির চেয়ে খরচ কম পড়বে।
তবে পেট্রোবাংলা জানায়, ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি অনুসন্ধান কূপ খনন, মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এজন্য মোট ১৮টি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ডিপিপি ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ৩টি ডিপিপি অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে। এ পর্যন্ত ৫০টি কূপের মধ্যে ১৮টির কাজ শেষ হয়েছে। কার্যক্রম চলমান কূপের সংখ্যা ৬টি। ১৮টি কূপের সফল খনন শেষে ১৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হলেও পাইপলাইনের অভাবে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে এ পর্যন্ত ৭৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত হয়েছে। তবে এই বৃদ্ধিকে গ্যাসের ঘাটতি মেটানোর জন্য যথেষ্ট মনে করছে না পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলা তথ্যমতে, নানামুখী প্রচেষ্টার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যে পরিমাণ গ্যাস সংযুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ গ্যাসের উৎপাদন বিদ্যমান গ্যাস ফিল্ড থেকে ক্রমান্বয়ে কমছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। বরং তা দিন দিন কমার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ অবস্থায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে স্বাভাবিক চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি-এর বিপরীতে গড়ে ২ হাজার ৪৫৩ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।
২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ৮৩ কার্গো, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ৯৪ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছে।
বিসিআইসির প্রস্তাব অনুযায়ী, দৈনিক ৩৩০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করতে হলে পেট্রোবাংলাকে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হবে। পেট্রোবাংলা বছরে ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করার সক্ষমতা রয়েছে। এই ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হলেই সার কারখানাগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী ৩৩০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘‘এর আগে বিসিআইসি সার শ্রেণিতে গ্যাসের বাড়তি দাম পরিশোধ করেনি। এমনকি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেও সেই দাম অনুযায়ী অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়নি।’’ তিনি বলেন, ‘‘এবার এ কারণেই বিসিআইসি চাইলেই আমরা গ্যাস সরবরাহ না বাড়িয়ে বিইআরসির মাধ্যমে গণশুনানির আয়োজন করেছি।’’ প্রসঙ্গত, আগামী ৬ অক্টোবর এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘‘সার শ্রেণিতে গ্যাসের দাম বাড়লেও দেশে সারের দাম বাড়বে না। আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কথা। গ্যাসের দাম বাড়লেও সারের দাম না বাড়লে সেটি সামাল দিতে ভর্তুকি দিতে হবে নতুন সরকারকে। নতুন সরকার বাড়তি ভর্তুকির চাপ কী করে সামলাবে, সেটি এখন দেখার বিষয়।’’
পেট্রোবাংলা বলছে, ‘‘সারের চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি আমদানি করতে হলে বছরে আরও অন্তত ছয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন।’’