মিরপুর ১২ নম্বর এলাকায় ছোট একটি ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বাস করেন আমেনা বেগম। প্রতিদিন ভোর থেকেই তার শুরু হয় অপ্রত্যাশিত এক যুদ্ধ। এই যুদ্ধটা স্কুলগামী দুই সন্তানের টিফিন তৈরির। এই যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই আবার শুরু করতে হয় স্বামীর নাস্তা আর দুপুরের লাঞ্চের জন্য প্রস্তুতি। তার কাছে এটি আরেক যুদ্ধ, কারণ গ্যাস থাকে না। ভোরের দিকে যা-ও একটু আসে, আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই আবার নেই। একসময় হাঁপিয়ে ওঠেন তিনি, কিন্তু নিরুপায়। কারণ দুপুরের বন্দোবস্ত হলেও রাতের খাবারের জন্য শুরু করতে হবে আরেক যুদ্ধ।
আমেনা জানান, গ্যাসের চুলার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দেশলাই ঘষেন। ফস করে আগুন জ্বলে, দুই সেকেন্ড পরেই নিভে যায়। যেন কেউ ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে ভেতর থেকে। আবার ঘষেন, চুলা জ্বালাতে যান, আবার নিভে যায়। স্বামীর আয়ের কারণে বাইরের খাবারের প্রতি আকর্ষণ তেমন একটা দেওয়া যাচ্ছে না। না হলে প্রতিদিন ভরসা ছিল বাড়ির নিচের হোটেলের নাস্তা, আর না হলে এলপিজি সিলিন্ডার এবং ইলেকট্রিক চুলা।
আমেনার স্বামী ফারুক আহমেদ একটি ওয়ার্কশপে কাজ করেন। বাইরে থেকে খাবার কিনে খাওয়ার বিলাসিতা তাদের নেই। বাসায় একটা ইলেকট্রিক চুলা আছে, কিন্তু গত মাসে কারেন্ট বিল এসেছে ৩ হাজার ২০০ টাকা। বিলের কাগজটা হাতে নিয়েই ফারুকের মুখ কালো হয়ে যায়। কথায় কথায় আমেনা বলেন, ‘গ্যাস আসে রাত ৩টার দিকে। পাশের ফ্ল্যাটের ভাবি গতকাল বলছিলেন, অ্যালার্ম দিয়ে উঠে রান্না কইরা রাখি’।
গতকাল (বুধবার) আমেনা ওই ভাবির কথা শুনে অ্যালার্ম দিয়ে ঘুম থেকে উঠেছিলেন। রাতে সাড়ে ৩টায় উঠে দেখলেন হালকা আগুন জ্বলছে। তাড়াতাড়ি চুলায় ডাল তুলে দেন। তার মধ্যে দিয়ে দেন দুটি ডিম। কিছুটা পানি ফুটে উঠতেই গ্যাসের চাপ কমা শুরু হলো। ডাল আর ডিম রয়ে গেলো আধা সেদ্ধ।
রাজধানীতে গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিনের। গ্যাসের চাপ বরাবরই কম থাকে। তবে গত কয়েক দিন ধরে গ্যাস সংকট প্রবল আকার ধারণ করেছে। বাসায় তো নেই-ই, শিল্পকারখানাতেও গ্যাসের সংকট। একদিকে কাজ বন্ধ, অন্যদিকে রান্নার যুদ্ধ। গৃহস্থালির চুলা থেকে শুরু করে বিশাল শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পরিবহন খাত পর্যন্ত এই সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছে—যা সার্বিক অর্থনীতিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি। এতে চাহিদার মাত্র ৫৬ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা।
গত সপ্তাহে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুনের পর সৃষ্ট যান্ত্রিক ত্রুটিতে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগে এলএনজি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলেও বর্তমানে তা ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে দেশে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ কমে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমেছে, যা আগে ছিল প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট।
গ্যাস না থাকায় ভোর থেকে রাত অবধি বাসাবাড়িতে গ্যাসের অভাবে রান্নায় বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও কোথাও একেবারেই চাপ কম থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে নগরবাসীকে। আবার নিম্ন আয়ের মানুষের ঘরে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেকেই চেষ্টা করছেন লাকড়ির চুলায় রান্না করতে।
রাজধানীর রামপুরা এলাকার গৃহিণী মৌসুমী আক্তার ব্যবহার করেন তিতাস গ্যাস। কিন্তু চলমান গ্যাস সংকটে ভয়াবহ অবস্থা চলছে তার। মাঝরাতে উঠে রান্না করতে হচ্ছে। আর সেই রান্নাতে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবারও খেতে হচ্ছে। রাতের খাবারের পর ঘুমিয়ে আবার সেই আড়াই-৩টার দিকে উঠে রান্না করছেন।
মৌসুমীর ভাষ্য, দিনের বেলায় যে পরিমাণ গ্যাস আসে তা দিয়ে রান্না করা অসম্ভব। রাত ২টার দিকে গ্যাসের চাপ একটু বাড়ে। তাতেই কোনোমতে রান্না করতে হয়। এভাবে এখন চলছে। তিনি বলেন, ‘কোনোদিন সকালের নাস্তা হোটেল থেকে কিনে খাই, আবার কখনও রাতেই রান্না করি। তিন বেলা খাবারের আগে ফ্রিজ থেকে সেই খাবার ওভেনে গরম করে খাওয়া লাগে। এছাড়া কোনও উপায় নেই।’
ক্ষুব্ধ কণ্ঠে মৌসুমী বলেন, ‘এই অবস্থা শুধু যে আমার একার—তা নয়, পুরো এলাকাজুড়েই এমন অবস্থা চলছে। গ্যাস নিয়ে যা হচ্ছে তা বন্ধ করা উচিৎ। সরকার টোটালি গ্যাস বন্ধ করে দিক আমরা সিলিন্ডার ব্যবহার করবো। তিতাস গ্যাসও টাকা নিবে, আবার ব্যাকআপ হিসেবে সিলিন্ডারও থাকবে, আমরা তো আর সেই ধরনের ফ্যামিলি না। যাদের টাকা আছে তারা করতে পারে, আমাদের পক্ষে সম্ভব না।
চলমান গ্যাস সঙ্কটের শুধু যে মৌসুমীর পরিবার ভুক্তভোগী তা নয়, যারা তিতাস গ্যাস ব্যবহার করেন তারা সবাই এখন ভুক্তভোগী।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস না থাকায় ভোর থেকে রাত অবধি বাসাবাড়িতে গ্যাসের অভাবে রান্নায় বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও কোথাও একেবারেই চাপ কম থাকায় বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। ভয়াবহ এই গ্যাস সংকটের কবলে পড়ে বাসাবাড়িতে কেউ কেউ ইলেকট্রিক চুলা কিনছেন। আর নিম্ন আয়ের মানুষ মাটির চুলায় লাকড়ি দিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, মিরপুর, বাড্ডা, রামপুরা ও বাসাবোসহ বিভিন্ন এলাকায়ও দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকছে না, রাতেও চুলা জ্বলে নিবু নিবু। কোথাও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকছে যে, রান্না করাই সম্ভব হচ্ছে না।
অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক চুলা, ইন্ডাকশন কুকার ও এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ গভীর রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লে তখন পরদিনের জন্য রান্না সেরে রাখছেন। রান্নার আয়োজনে পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ।
বাড্ডা এলাকার গৃহবধূ ফিরোজা বেগম বলেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চলা যায়?
রামপুরার মোর্শেদা সেতু বলেন, সকাল থেকে গ্যাসের চাপ এতটাই কম ছিল যে কোনও রান্না করা সম্ভব হয়নি। রাত নয়টার পর গ্যাস এলেও শুধু ভাত রান্না করতেই প্রায় এক ঘণ্টা সময় লেগেছে। অন্য কোনও রান্না করা সম্ভব হয়নি।
বাড্ডা এলাকার মার্জিয়া আক্তার বলেন, দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টা চুলায় কড়াই বসিয়ে রেখেও তেল গরম করা যায়নি। ছোট শিশুর জন্য সময়মতো খাবার তৈরি করতে না পেরে প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।
জানা যায়, যেসব বাসায় সিলিন্ডার রয়েছে তারাই কেবল রান্নাবান্নায় সুবিধা করছেন। অর্থাৎ তাদের এই সংকট ছুঁতে পারছে না। সিলিন্ডার ব্যবহৃত বাসাবাড়ি রাজধানীতে খুবই কম। প্রায় সকল বাসাবাড়িতেই তিতাস গ্যাস ব্যবহার হয়। প্রায় পুরো রাজধানীবাসী এখন গ্যাস সংকটে নিমজ্জিত।
গ্যাস সহসা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালের একটি গত ২১ জুলাই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে ও কারিগরি ত্রুটির কারণে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যাওয়া এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি (এফএসআরইউ) মেরামত করে পুনরায় সচল করতে আরও ১০-১২ দিন সময় লাগতে পারে। একটি বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি (আরএলএনজি) সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমেছে। ফলে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম ও রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। এই ত্রুটি সারাতে আরও ১০-১২ দিন লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পেট্রোবাংলা এবং রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) জানিয়েছে, যুক্তরাজ্য, রোমানিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিদেশি বিশেষজ্ঞ দল স্থানীয় কারিগরি দলের সঙ্গে মিলে এর মেরামত কাজ শুরু করেছে। টার্মিনালের দুটি বয়লারের মধ্যে আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মহেশখালীর দুটি টার্মিনাল থেকে ১০০ থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছিল। হঠাৎ কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ ৬০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। এতে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে গেছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ টিম ত্রুটি সারাতে চেষ্টা চালাচ্ছে। বিদেশ থেকে কিছু সরঞ্জাম আনতে হবে। এগুলো পৌঁছে গেলে দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’