চলমান গ্যাস সংকটের পরিস্থিতির বদলায়নি। গত কয়েকদিনের মতো শনিবারও (১৫ আগস্ট) সকাল থেকে রাজধানীতে একদিকে সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সংকট চলছে, অন্যদিকে সংকট তীব্র বাসাবাড়িতেও। তীব্র গ্যাস সংকটে রাজধানীসহ সারাদেশে তৈরি হয়েছে এক ধরনের হাহাকার। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত পরিবহন চালকরা। দিনের বেশির ভাগ সময়ই তাদের কাটছে ফিলিং স্টেশনের সামনে লাইনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও যে গ্যাস মিলছে, তা দিয়ে একটি অটোরিকশা দুই ট্রিপও দিতে পারছে না। স্বল্পচাপের কারণে অনেক সিএনজি স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
শুধু পরিবহন নয়, বাসাবাড়িতেও ভোগান্তি চরমে। অনেক স্থানে দিনের বেলায় জ্বলছে না চুলা। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার গ্যাস ও বৈদ্যুতিক চুলায় চলছে রান্না। সংকট এমন অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে যে গ্যাস এখন বাড়িতেও নেই, গাড়িতেও নেই। থমকে গেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
মিরপুরে দীর্ঘ লাইন
গাবতলী, কল্যাণপুর, কালশী, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া এলাকার সিএনজি স্টেশন ঘুরে গাড়ির দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় স্টেশনগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও অটোরিকশাকে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
গাবতলীর মোহনা ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ প্রাইভেটকার চালক খলিল বলেন, গ্যাস সংকট আরও বেড়েছে। গভীর রাতে সামান্য পাওয়া গেলেও দিনে পাওয়া যাচ্ছে না। দেড় ঘণ্টার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে যে গ্যাস পেয়েছেন, তা দিয়ে মাত্র দুটি ট্রিপ দিতে পেরেছেন। এখন আবার লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি।
‘আমাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই’, বলেন খলিল।
ডেমরায় চার ঘণ্টার অপেক্ষা
ডেমরা এলাকাতেও একই অবস্থা। সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য পরিবহন চালকদের চার ঘণ্টার বেশি অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। প্রতিটি স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ লাইন। যাত্রী টানতে না পারায় রুজি-রোজগার ও পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বেশির ভাগ চালক। গ্যাস বিক্রি কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে ফিলিং স্টেশন মালিকদেরও।
রাসেল ফিলিং অ্যান্ড সিএনজি স্টেশনে রেন্ট-এ-কার চালক মো. বশির হাওলাদার বলেন, ঠিকমতো গ্যাস না পাওয়ায় প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে। দূরপাল্লার যাত্রী নিতে পারছেন না। যাত্রী গাড়িতে রেখে এখন আর গ্যাস নেওয়া যায় না। কারণ ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা লাইনে থাকতে হচ্ছে।
‘আর এভাবে চলতে থাকলে আমাদের পরিবারের সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে’, বলেন বশির।
পাঁচ ঘণ্টা লাইনে, তবু গ্যাস নেই
মুগদা, মানিকনগর, সবুজবাগ, খিলগাঁও, বনশ্রী ও হাজীপাড়া এলাকায় অন্যদিনের তুলনায় বেশি গ্যাস সংকট দেখা যায়। গ্যাসের চাপ সর্বনিম্ন। ফলে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় সিএনজিচালিত যানবাহন চালকদের। এ সময় অনেক ফিলিং স্টেশনে ‘গ্যাস নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখতেও দেখা যায়।
শান্ত ফিলিং স্টেশনে লাইনে থাকা চালক কবির হোসেন বলেন, সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েছেন। দুপুর ২টা পর্যন্ত সিরিয়াল পাননি। দিন যত যাচ্ছে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
গ্যাস না পেলেও মালিককে প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয় জানিয়ে কবির বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে কী করব বুঝতে পারছি না।’
উত্তরায়ও তীব্র সংকট
উত্তরায় গ্যাস সংকট ছিল তীব্র। গ্যাসের অভাবে অধিকাংশ সিএনজি ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ বন্ধ ছিল। আর যেসব স্টেশন চালু রাখা হয়েছিল, চাপ কম থাকায় সেগুলোতে তৈরি হচ্ছে পরিবহনের লম্বা লাইন।
খন্দকার ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার কামাল আহমেদ বলেন, পরিবহনের বড় একটি অংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ফলে গ্যাসের চাপ কম থাকায় পরিবহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে তাদের কিছুই করার নেই।
সিএনজিচালক জসিম বলেন, ‘রাত থেকে লাইনে আছি, এখনো গ্যাস পাইনি। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালাব কীভাবে। সামনে বাচ্চাদের স্কুলের বেতন দেব কীভাবে। এত মানসিক চাপ আর নিতে পারছি না।’
চুলা জ্বলছে না বাসাবাড়িতে
শুধু সিএনজি ফিলিং স্টেশন নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতেও গ্যাস সংকট চরমে। গ্যাস না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বলছে না বাসার চুলা। বাধ্য হয়ে অধিকাংশ পরিবারকে সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলায় রান্নার কাজ করতে হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে অনেকে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা জাহানারা বেগম বলেন, ভোরে গ্যাস থাকলে সারা দিনের রান্না করে রাখা যায়। কিন্তু গত ৩ দিন ধরে গ্যাস নেই বললেই চলে। বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে।
আমেনা বেগমের ভোগান্তিটা আরও আলাদা। রাজধানীর উত্তরায় ‘মম চাইল্ড কেয়ার’ নামে একটি ডে কেয়ার চালান তিনি। ডে কেয়ারটিতে এখন শিশু আছে ২০ জনের মতো। গ্যাস না থাকায় তাদের স্কুলের ডে-কেয়ারে শিশুদের জন্য রান্না বন্ধ। এখন হোটেল থেকে খাবার কিনে দিতে হচ্ছে শিশুদের।
আমেনা বেগম বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় আমাদের স্কুলের ডে-কেয়ারে শিশুদের জন্য রান্না বন্ধ। হোটেল থেকে খাবার কিনে দিতে হচ্ছে। এলপিজি গ্যাসও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইনডাকশন চুলা ও রাইস কুকারের দামও বেড়ে গেছে।’
গ্যাসের এই সংকট শুধু ঘরের রান্না কিংবা সড়কের পরিবহনেই আটকে নেই। দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পথে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যও স্থবির হয়ে পড়ছে। গ্যাস না থাকায় মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দও থমকে গেছে।