এলএনজি কার্গো আসায় আপাতত গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও দেশের জ্বালানি সংকট একেবারে স্বাভাবিক হচ্ছে না। তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল চালু না হওয়া পর্যন্ত গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, নতুন একটি টার্মিনাল নির্মাণ ও চালু করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। ফলে ততদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েই চলতে হবে জ্বালানি খাতকে। স্থায়ী সমাধানে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অগ্নিকাণ্ডের পর প্রকট সংকট
গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। একদিকে গ্যাসের সংকট, অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও ঠিকমতো চলতে পারেনি। এতে এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়।
পরে টার্মিনালটি মেরামত করে চালু করা হলেও এলএনজি কার্গো না থাকায় আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশের দৈনিক গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ও সার্বিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনায়। সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি তুলে ধরে জনগণের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দুঃখ প্রকাশ করে বার্তা দেন।
এ ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এমনকি আজ রবিবার (২৩ আগস্ট) পেট্রোবাংলার সন্ধ্যা ৬টার হিসাবে, মোট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে ২ হাজার ৩৮২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬২৪ এবং এলএনজি থেকে সরবরাহ আরও বেড়ে ৭৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট পাওয়া গেছে।
দৈনিক ঘাটতি ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট
পেট্রোবাংলার হিসাবে, এখন দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়েও সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে ১ হাজার এবং বাকি ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন আসে দেশীয় গ্যাস থেকে। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতির পরিমাণ ১ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
এই পরিস্থিতিতে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন আরও কমে গেলে সংকট বাড়তে থাকবে। আবার সরকার মহেশখালীতে একাধিক টার্মিনাল নির্মাণ করবে, সেই ব্যবস্থাও নেই। মহেশখালী থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যে পাইপলাইন রয়েছে, তা দিয়ে আর ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস আনা সম্ভব নয়। অর্থাৎ মহেশখালীতে তৃতীয়টির পর চতুর্থ টার্মিনাল নির্মাণ করতে হলে একই সঙ্গে নতুন পাইপলাইন নির্মাণেরও উদ্যোগ নিতে হবে। যা ব্যয় ও খরচসাপেক্ষ বলে মনে করা হয়।
সরকারের বক্তব্য
গত ১৬ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত ২ বছর সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। ৬ মাস কিংবা ১ বছরে এর সমাধান হবে না। ন্যূনতম দুই বছর লাগবে। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করতেই প্রায় দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে। ফলে এর আগে গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান করা কঠিন।’
এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গত ১৩ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে বলেন, আগামী ২০২৯ সালের মধ্যে দেশে আরও নতুন এফএসআরইউ স্থাপন এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান বাড়াতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। বর্তমান সংকট সাময়িক এবং সরকার মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধকালীন তৎপরতার মতো পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছর অনুসন্ধান না করে শুধু আমদানির ওপর ভিত্তি করে দেশটাকে একটি জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে। আবার আমদানির জন্য হলেও যদি ইনফ্রাস্ট্রাকচারটা তৈরি ঠিকমতো করতো, দুটো এফএসআরইউর জায়গায় যদি চারটি এফএসআরইউ বসাতো, তাহলে আজকে এই সমস্যাটা দেখতে হতো না। আমেরিকা থেকে একটি বড় দল বিনিয়োগের জন্য আসছে, তারা এফএসআরইউতে বিনিয়োগ করতে চায়। তাদের আগ্রহের বিষয়ে দ্রুত চিঠি দিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
নতুন টার্মিনালে গ্যাস পেতে দুই বছর
জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, সরকার মহেশখালীতে নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। চীনা কোম্পানি সিএনইসিকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদন হলেও এখনও চুক্তি সই হয়নি। চীনা কোম্পানিটি চুক্তি সইয়ের পর ২২ মাসের মধ্যে টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ফলে দ্রুত চুক্তি হলেও নতুন টার্মিনাল থেকে গ্যাস পেতে প্রায় দুই বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে। তবে এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে গেলে সংকট বাড়তে পারে।
দেশীয় গ্যাসেও তাৎক্ষণিক সমাধান নেই
নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়েও তাৎক্ষণিক সংকট সমাধানের সুযোগ নেই। স্থলভাগে বড় কোনও গ্যাস খনি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি যেসব খনি থেকে গ্যাস তোলা হচ্ছে, প্রায় প্রতিদিনই সেখানকার উৎপাদনের পরিমাণ কমছে। দেশের সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদনকারী বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন এখন গত তিন বছরের তুলনায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে।
সূত্র জানায়, দেশের দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৭৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে ২০-২১ আগস্টের হিসাবে এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৬২৯ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫৯ শতাংশ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ৮৫১ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৪৭৪ দশমিক ১ মিলিয়ন ঘনফুট। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) সক্ষমতা ১৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও উৎপাদন হয়েছে ১৩৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট। আর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) গ্যাসক্ষেত্রগুলোর ১৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১১০ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট।
আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর পরিচালিত জালালাবাদ, মৌলভীবাজার, বিবিয়ানা ও বাঙ্গুরা গ্যাসক্ষেত্র মিলিয়ে এসব ক্ষেত্রের দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ৯০৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন ঘনফুট।
শুধু টার্মিনাল নয়, দরকার গ্যাস অনুসন্ধানও
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল টার্মিনাল বানালেই হবে না। গ্যাস কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থও থাকতে হবে। আমদানি নির্ভরতা যত বাড়বে, জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় তত বাড়বে। সে জন্য বিকল্প চিন্তাও করতে হবে। সরকার অবশ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে সেটিও সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ বিষয়।
এর বাইরে দেশীয় উৎপাদনও বাড়াতে হবে। যেসব বিদ্যমান খনি রয়েছে, সেখানকার উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি ডিপ ড্রিলিং, নতুন খনি খোঁজা এবং সাগরে অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। যদি সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু হয়, তাহলে ১০ বছরের আগে গ্যাস গ্রিডে আনার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম মনে করেন, গ্যাস সংকট কাটাতে নেওয়া বড় উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে দুই থেকে পাঁচ, এমনকি সাত বছরও সময় লাগতে পারে। তবে প্রতি বছর পাঁচ-ছয়টি করে গ্যাসকূপ অনুসন্ধান করা গেলে এবং যদি গ্যাস পাওয়া যায়, তাহলে পাঁচ বছরের মধ্যে গ্যাসের অভাব অনেকটাই দূর করা সম্ভব।