গ্যাস নেই, শিল্প খাত‌ চলছে কীভাবে  

তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটে দেশের শিল্প খাত এখন এক অভূতপূর্ব বাস্তবতার মুখোমুখি। কোথাও কারখানা বন্ধ, কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে কোথাও স্টিম বয়লারে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ, কোথাও ধানের তুষ থেকে তৈরি হচ্ছে বিকল্প জ্বালানি, আবার বড় ইস্পাত কারখানাগুলো ফার্নেস অয়েল ও লাইট ডিজেল অয়েল ব্যবহার করে সীমিতভাবে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে।

এই ভিন্ন ভিন্ন চিত্রের পেছনে মূল সংকট একটাই—গ্যাস নেই, আর যেখানে আছে, সেখানেও প্রয়োজনীয় চাপ নেই।

বাংলাদেশের শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসকে তুলনামূলক সস্তা ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ধরে উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকট সেই নির্ভরতার দুর্বলতা নতুন করে সামনে এনেছে। গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেডিং যুক্ত হওয়ায় বস্ত্র, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং, ইস্পাতসহ বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা এখন টালমাটাল।

ফলে শিল্পের সামনে এখন আর শুধু একটি প্রশ্ন নেই—কবে গ্যাস আসবে? বরং বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে, গ্যাস না থাকলে দেশের শিল্প কি বিকল্প জ্বালানির ওপর ভর করে উৎপাদন সচল রাখার সক্ষমতা তৈরি করেছে?

নরসিংদীতে কারখানার চুলায় কাঠ

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্রশিল্পাঞ্চল নরসিংদীতে। সেখানে শতাধিক কারখানা বন্ধ অথবা উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমাতে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে অন্তত ৫০টি কারখানা বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠ পোড়াচ্ছে।

বিশেষ করে সুতা প্রক্রিয়াজাতকারী সাইজিং এবং ডাইং কারখানাগুলো বেশি বিপদে পড়েছে। এসব কারখানায় স্টিম বয়লার চালাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের প্রয়োজন। আগে অনেক কারখানা বিকল্প হিসেবে ঝুট বা বস্ত্রের বর্জ্য ব্যবহার করতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঝুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক মালিক এখন কাঠের দিকে ঝুঁকেছেন।

স্থানীয় শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি কারখানাকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হচ্ছে শুধু কাঠ কিনতে। এর সঙ্গে রয়েছে পরিবহন, শ্রম ও বয়লার পরিচালনার অতিরিক্ত ব্যয়। ফলে গ্যাসের অভাব মেটাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।

কিন্তু কাঠ পোড়ানো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি হিসেবে ব্যাপকভাবে কাঠ ব্যবহার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। অনুমতি ছাড়া গাছ কাটার বিষয়টিও আইনি প্রশ্নের সৃষ্টি করে। অর্থাৎ গ্যাস সংকট থেকে বাঁচতে গিয়ে শিল্পাঞ্চল নতুন একটি পরিবেশগত সংকটের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

উৎপাদন কমেছে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত

নরসিংদীতে ছোট-বড় মিলিয়ে কয়েক হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর বড় অংশই বস্ত্র, ডাইং, সাইজিং, স্পিনিং ও তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ কারখানা সরাসরি গ্যাসনির্ভর।

স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য এসব কারখানায় ১০ থেকে ১৫ পিএসআই চাপে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। কিন্তু আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে গ্যাস সংকট শুরু হওয়ার পর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

ফলে যেসব কারখানা এখনও সীমিতভাবে চালু আছে, সেগুলোর অনেকটিতে উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। কোনো কোনো কারখানা মাত্র ১০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে।

চৌয়ালা শিল্পাঞ্চলের একটি বড় প্রতিষ্ঠান মোমিন টেক্সটাইল মিলের ১০টি ইউনিটের মধ্যে সাতটিই গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানাটির প্রতিদিন প্রায় ২২ থেকে ২৩ হাজার ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ৮ থেকে ১০ হাজার ঘনফুটের মতো।

এর প্রভাব উৎপাদনে স্পষ্ট। প্রতিদিন ২৫ লাখ গজ কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ২০ হাজার গজে। কারখানাটির আড়াই হাজার শ্রমিকের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক কার্যত উৎপাদনকাজের বাইরে রয়েছেন।

শুধু একটি কারখানা নয়, নরসিংদীর বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে শ্রমিকদের ছুটিতে পাঠাচ্ছে। কোথাও দুটি শিফটের পরিবর্তে একটি শিফট চালু রাখা হয়েছে, কোথাও কাঁচামাল থাকলেও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

অর্থাৎ জ্বালানি সংকট এখন শুধু শিল্পমালিকের আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়। এটি কর্মসংস্থান, শ্রমিকের আয়, স্থানীয় অর্থনীতি এবং শিল্পাঞ্চলের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।

কারখানা বন্ধ মানেই খরচ বন্ধ নয়

গ্যাস না থাকলে উৎপাদন বন্ধ করা যায়, কিন্তু কারখানার সব ব্যয় বন্ধ হয় না। শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, বিভিন্ন ধরনের পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য স্থায়ী খরচ বহন করতেই হয়।

এ কারণেই দীর্ঘদিন কারখানা কম সক্ষমতায় চললে লোকসানের চাপ দ্রুত বাড়ে।

ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, একটি কারখানা যখন পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারে, তখন স্থায়ী খরচ বেশি পরিমাণ পণ্যের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। ফলে প্রতি ইউনিট উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এলে একই স্থায়ী খরচ কম পণ্যের ওপর পড়ে। ফলে প্রতি টন বা প্রতি ইউনিট পণ্যের ব্যয় বেড়ে যায়।

অর্থাৎ গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পের ক্ষতি শুধু ‘উৎপাদন না হওয়ার’ ক্ষতি নয়; উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণেও প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।

ইস্পাত খাতেও অচলাবস্থা

বস্ত্রশিল্পের পাশাপাশি গ্যাস সংকটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের ইস্পাত উৎপাদন খাত। বড় কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, আর প্রায় ৪০ শতাংশ রি-রোলিং মিলের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দেশের অন্যতম শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের মাসিক উৎপাদন স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টন। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে চলতি মাসে উৎপাদন কমে প্রায় দেড় লাখ টন বা তারও নিচে নেমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেছেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় কারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও গ্রাহকের চাহিদা মেটানো এবং শ্রমিকদের কাজে ধরে রাখার জন্য উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে এর জন্য ব্যবহার করতে হচ্ছে ফার্নেস অয়েল ও লাইট ডিজেল অয়েলের মতো বিকল্প জ্বালানি।

সমস্যা হলো, এসব জ্বালানির খরচ গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি। বিএসআরএমের হিসাবে, ফার্নেস অয়েল ও এলডিও ব্যবহার করলে জ্বালানি ব্যয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় চারগুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

ফলে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করেও কারখানা স্বাভাবিক সক্ষমতায় চালানো অর্থনৈতিকভাবে কঠিন। প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

চট্টগ্রামে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য

চট্টগ্রামের মতো দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

এর ফলে কেএসআরএম, জিপিএইচ ইস্পাত, এইচএম স্টিল, গোল্ডেন ইস্পাত ও আনোয়ার ইস্পাতসহ বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান উৎপাদন স্থগিত রাখতে কিংবা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী বলেন, দেশের বেশিরভাগ স্টিল মিল এখন উৎপাদন সংকটে রয়েছে। এই শিল্পের জন্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ প্রায় অপরিহার্য। গত দুই সপ্তাহে কিছু কারখানায় একেবারেই গ্যাস সরবরাহ ছিল না।

কিছু সমন্বিত কারখানা সরাসরি গ্যাস ছাড়া বিলেট উৎপাদনের সক্ষমতা রাখলেও সেগুলো আবার বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে সমস্যায় পড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান মাত্র ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে।

এখানেই সংকটের আরেকটি দিক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটি জ্বালানি সংকটের বিকল্প হিসেবে যখন বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন বিদ্যুৎ ঘাটতিও শিল্পের উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছে।

পুরোনো আর্থিক ক্ষতের ওপর নতুন আঘাত

ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট এমন এক সময়ে এসেছে, যখন শিল্পটি আগের কয়েক বছরের আর্থিক চাপ থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম ও জাহাজভাড়া বেড়ে যায়। একই সময়ে দেশের ডলার সংকটের কারণে অনেক আমদানিকারক বিলম্বিত মূল্য পরিশোধের শর্তে কাঁচামাল আনতে বাধ্য হন।

কিন্তু ঋণপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ডলারের বিনিময় হার অনেক বেড়ে যায়। একসময় ৮৫ টাকার কাছাকাছি থাকা ডলারের দাম বিভিন্ন পর্যায়ে ১১০ থেকে ১২৭ টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। এর ফলে ইস্পাত খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতি টনে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিময় হারজনিত লোকসানের মুখে পড়ে।

এই লোকসান কোম্পানিগুলোর চলতি মূলধনের ওপর বড় চাপ তৈরি করে। তার ওপর ব্যাংকঋণের উচ্চ ব্যয়, বিক্রির মন্দা এবং নির্মাণ খাতে ধীরগতির মতো সমস্যাও রয়েছে।

এখন সেই পুরোনো চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন জ্বালানি সংকট।

ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সামনে প্রশ্ন উঠছে—লোকসান দিয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া ভালো, নাকি কারখানা বন্ধ রাখা?

সামনে নির্মাণ মৌসুম, বাড়তে পারে ইস্পাতের দাম

বর্তমানে বাজারে প্রতি টন ইস্পাত রড ৮১ হাজার থেকে ৮৭ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু কারখানার উৎপাদন দীর্ঘদিন কম থাকলে সরবরাহ সংকট আরও বাড়তে পারে।

সাধারণত অক্টোবর থেকে দেশের নির্মাণকাজের মূল মৌসুম শুরু হয়। এই সময়ে আবাসন খাত, বেসরকারি নির্মাণকাজ এবং বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে ইস্পাতের চাহিদা বাড়ে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, তার আগেই যদি কারখানাগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিক না হয়, তাহলে বাজারে সরবরাহ কমে ইস্পাতের দাম বাড়তে পারে।

এর প্রভাব শুধু ইস্পাত ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়লে আবাসন খাত, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

এক সংকট থেকে আরেক সংকট

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের শিল্পখাত এক ধরনের জ্বালানি চক্রে আটকে পড়েছে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট হলে কারখানা কাঠ পোড়াচ্ছে। কাঠের ব্যবহার বাড়লে পরিবেশগত উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল ব্যবহার করলে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করলে লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ ঘাটতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

আর উৎপাদন বন্ধ রাখলে শ্রমিক, ব্যাংক, সরবরাহকারী ও ক্রেতা—সব পক্ষের ওপর চাপ বাড়ছে।

অর্থাৎ শিল্পের সামনে এখন কার্যকর কোনো সহজ বিকল্প নেই।

তুষের গ্যাস দেখাচ্ছে ভিন্ন পথ

এই সংকটের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মিথিলা টেক্সটাইল মিলস একটি ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ধানের তুষ ব্যবহার করে গ্যাসিফিকেশন পদ্ধতিতে বিকল্প জ্বালানি উৎপাদন করছে।

নিজস্ব ব্যবস্থায় তুষ পুড়িয়ে বাষ্প উৎপাদন করা হয় এবং সেই প্রক্রিয়া থেকে উৎপন্ন জ্বালানি কারখানার বিভিন্ন ইউনিটে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে উইভিং, ডাইং, ওয়াশিং ও ফিনিশিংসহ চারটি ইউনিটের বড় অংশ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার ১৬০ ঘনমিটার সমপরিমাণ জ্বালানি উৎপাদন হচ্ছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করছে।

ফলে জাতীয় গ্রিডের গ্যাস সংকট থাকলেও কারখানার উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে।

তবে এই ব্যবস্থাও বিনা খরচে আসেনি। বিকল্প জ্বালানি প্ল্যান্ট স্থাপনে প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ করতে হয়েছে এবং প্রযুক্তি স্থাপন ও উৎপাদন পর্যায়ে যেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।

এখানেই বড় শিক্ষা রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা তৈরি করা সম্ভব, কিন্তু তার জন্য সংকট আসার পর জরুরি সিদ্ধান্ত নিলে হবে না। প্রয়োজন আগাম পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ।

বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নাকি জাতীয় কৌশল?

বাংলাদেশের শিল্পখাত দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল। গ্যাসের তুলনামূলক কম দাম ও সহজলভ্যতার কারণে বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান করেনি।

কিন্তু সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়ে দিয়েছে, একটি মাত্র জ্বালানি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পুরো শিল্পব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

তাই এখন প্রয়োজন শিল্পের জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কৃষি বর্জ্য ও ধানের তুষ থেকে জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে জ্বালানি, জ্বালানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস নিয়ে শিল্পখাতে আরও বড় পরিসরে চিন্তা করতে হবে।

সব শিল্পে একই ধরনের বিকল্প জ্বালানি কার্যকর হবে না। টেক্সটাইল কারখানার জন্য যে ব্যবস্থা উপযোগী, ইস্পাত কারখানার জন্য সেটি যথেষ্ট নাও হতে পারে। তাই খাতভিত্তিক জ্বালানি কৌশলও প্রয়োজন।

সরকারের দায়িত্ব শুধু জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো নয়; শিল্পকারখানাকে এমন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে একটি জ্বালানি সংকট পুরো উৎপাদনব্যবস্থাকে অচল করে দিতে না পারে।

শিল্পের সামনে এখন দুটি পথ

স্বল্পমেয়াদে শিল্পমালিকদের প্রধান দাবি হলো—জাতীয় গ্রিডে দ্রুত পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করার একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো।

উৎপাদনকারীরা জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। কারণ অনিশ্চয়তা শিল্পের জন্য সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। কারখানা কখন স্বাভাবিকভাবে চালানো যাবে, তা জানা না থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনা, কাঁচামাল কেনা, শ্রমিক ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতাদের সঙ্গে সরবরাহের প্রতিশ্রুতি—সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু এলএনজি এনে সাময়িক সংকট মোকাবিলা করাই যথেষ্ট নয়। আমদানিকৃত ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে গ্যাস অবকাঠামো, সরবরাহ পরিকল্পনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পাঞ্চলের জ্বালানি চাহিদার মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন।

নরসিংদীর কারখানার চুলায় এখন যে কাঠ পুড়ছে, তা দেশের শিল্পের জ্বালানি সংকটের প্রতীক। চট্টগ্রামের ইস্পাত কারখানায় যে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল পোড়ানো হচ্ছে, তা বিকল্প জ্বালানির বিপুল খরচের প্রতীক। আর আড়াইহাজারের একটি কারখানায় ধানের তুষ থেকে তৈরি জ্বালানি দেখাচ্ছে—আগাম পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ থাকলে ভিন্ন পথও তৈরি করা সম্ভব।

এই তিনটি ছবিই এখন বাংলাদেশের শিল্পখাতের বাস্তবতা।

প্রশ্ন হলো, আগামী দিনেও কি দেশের শিল্প গ্যাসের সরবরাহের অপেক্ষায় কারখানা বন্ধ রাখবে, নাকি বর্তমান সংকটকে একটি নতুন জ্বালানি নীতি ও শিল্প কৌশল তৈরির সুযোগ হিসেবে নেবে?

কারণ সংকট শেষ হলে কারখানার চাকা হয়তো আবার ঘুরবে। কিন্তু পরবর্তী সংকটের আগে যদি বিকল্প জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং সরবরাহ নিরাপত্তার ব্যবস্থা তৈরি না হয়, তাহলে একই দৃশ্য আবার ফিরে আসবে—গ্যাস নেই, কারখানা বন্ধ; আর শিল্প বাঁচাতে কোথাও পোড়ানো হবে কাঠ, কোথাও ব্যয়বহুল তেল, আর কোথাও নতুন প্রযুক্তির সন্ধানে ছুটতে হবে উদ্যোক্তাদের।